রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজের আঙিনা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য তরুণ মুহাম্মদ আব্দুল বারেক পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর পাকিস্তানের লাহোরে। মেধার জোরে চাকরিও জুটে গিয়েছিল সেখানে। পরিচিত মহলে তিনি সংক্ষেপে পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘এম. এ. বি.’ নামে। কিন্তু জীবনের গতিপথ তো সরলরেখায় চলে না। একাত্তরে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো, তিনি তখন সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে অবরুদ্ধ পশ্চিম পাকিস্তানে। যুদ্ধ যখন তীব্র, তখন এক দালালের সহায়তায় পেশোয়ারের দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে, আফগানিস্তান হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফিরে আসেন মুক্ত মাতৃভূমিতে।স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি একটি স্বনামধন্য ব্যাংকে উচ্চপদে যোগ দেন। তাঁর স্ত্রীও ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের উচ্চশিক্ষিতা নারী; তিনিও একটি আন্তর্জাতিক এনজিওতে কর্মজীবন শুরু করেন। সংসারে এলো এক ছেলে ও এক মেয়ে। দু’জনের উপার্জনে সংসার ছিল সচ্ছল, কিন্তু তাঁদের সমস্ত মনোযোগ গিয়ে ঠেকল সন্তানদের ভবিষ্যতের দিকে। দেশের সেরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে সন্তানরা বড় হতে লাগল। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল একটাই—নিজেদের জীবনের সবটুকু দিয়ে সন্তানদের বড় করবেন, আর শেষ বয়সে সেই সন্তানের স্নেহের ছায়াতলে শান্তিতে দিন কাটাবেন।ভবিষ্যতের কথা ভেবে চাকরির ফাঁকে গ্রামের পৈতৃক জমিটুকু বিক্রি করে ঢাকায় এক টুকরো জমি কিনেছিলেন বারেক সাহেব। ভেবেছিলেন, শেকড় তো আর পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায় না। কিন্তু দিন গড়ায়। সন্তানরা 'এ' লেভেল শেষ করে জেদ ধরল—তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতেই হবে। বাবা-মা কি সন্তানের আবদার ফেলতে পারেন? তাছাড়া গর্ভের সন্তান বিলেতফেরত হবে—এই মধ্যবিত্ত অহংকারও তখন চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল। একমুহূর্ত না ভেবে ঢাকার একমাত্র সম্বল সেই শেষ জমিও বিক্রি করে দিলেন। ছেলেকে পাঠানো হলো কানাডায়, মেয়েকে অস্ট্রেলিয়ায়।সন্তানরা পড়াশোনা শেষ করল। কিন্তু ফেরার কোনো লক্ষণ নেই। উল্টো নিজেদের সিদ্ধান্তে সেখানেই সংসার পাতল, বাবা-মাকে একটিবার জানানোর প্রয়োজনও বোধ করল না। দেশে ফেরার কথা বললেই সাফ জানিয়ে দিত, "দেশে গিয়ে কী করব? এখানে তো ক্যারিয়ার গুছিয়ে নিয়েছি।" বাবা-মা দীর্ঘশ্বাস চেপে নিজেদের মনকে বোঝাতেন, সন্তানরা ভালো আছে, এটাই তো শান্তি! তারা কোনোদিন একটি পয়সাও দেশে পাঠায়নি, বরং মুখ ফুটে বলেছে, "তোমাদের তো হাত পাততে হচ্ছে না, এতেই সন্তুষ্ট থাকো।"
নাতি-নাতনি হওয়ার পর বাবা-মা জানতে পারেন ছেলেমেয়ের বিয়ের খবর। আঘাত লাগলেও তাঁরা সান্ত্বনা খুঁজে নিতেন, হয়তো নাগরিকত্ব পাওয়ার সুবিধার্থেই এমন করেছে। এরপর স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভিডিও কল আর ছবির ফ্রেমেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেল রক্ত সম্পর্কের টান। স্ক্রিনে হাসিমুখ দেখিয়ে কল কেটে ভেতরে যে তীব্র হাহাকার জন্ম নিত, তা দেখার কেউ ছিল না।একসময় ব্যাংক থেকে অবসর নিলেন এম. এ. বি.। শরীরের বার্ধক্য আর মনের নিঃসঙ্গতা জেঁকে বছিল। একদিন আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নিঃশব্দে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন তিনি। ঘরে তখন কেবল তাঁর অসুস্থ, অশক্ত বৃদ্ধা স্ত্রী। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি নেই, স্বামীকে সেবা দেবেন কী করে? কাজের লোক দিয়ে পরিচিত মহলে খবর পাঠানো হলো। সুদূর প্রবাসে সন্তানদের জানানো হলে তারা শুকনো মুখে জানাল, "এত দূর থেকে হুট করে আসা সম্ভব নয়। আমাদের জন্য অপেক্ষা না করে লোক ডেকে দাফনের ব্যবস্থা করে ফেলুন।"
রক্তের সম্পর্কের শেষ মূল্যায়ন এটুকুই। কোনো স্বজন নয়, মসজিদের খাদেম ডেকে সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সম্পন্ন হলো একজন মানুষের শেষ বিদায়। এমনকি কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্য দোয়াটুকুও পড়ানো হলো ভাড়ায়।
স্বামীর মৃত্যুর পর বৃদ্ধা নারী আরও ভেঙে পড়লেন। বিছানাগত এই অসুস্থ মানুষটিকে দেখার মতো কেউ রইল না। একপর্যায়ে দূর সম্পর্কের আত্মীয়রা মিলে তাঁকে রেখে এলো গ্রামের এক বৃদ্ধাশ্রমে। যে সন্তানকে মানুষ করতে জীবনের শেষ সম্বলটুকু বিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল, শেষ বয়সে সেই মায়ের ঠিকানা হলো চার দেয়ালের অচেনা এক আশ্রমে। এই করুণ পরিণতি কেবল একজন আব্দুল বারেক বা তাঁর স্ত্রীর একার নয়; এ যেন বর্তমান ভোগবাদী ও দিশেহারা সমাজব্যবস্থার এক নির্দয় প্রতিচ্ছবি। পৃথিবী এখন বিজ্ঞানের অন্ধ মোহে মহাকাশে বাহন পাঠাতে ব্যস্ত, আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ-নক্ষত্রে বসতি গড়ার নেশায় ব্যাকুল। অথচ যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ বেঁচে থাকে, সেখানেই শিকড় আলগা হয়ে পড়ছে।পশ্চিমা বা উন্নত বিশ্বের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবার হয়তো ব্যক্তিকেন্দ্রিক, কিন্তু তাদের রাষ্ট্র কাঠামোতে বয়োবৃদ্ধদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক যত্ন নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক ফ্রেমওয়ার্ক রয়েছে। সেখানে নৈতিকতার প্রাথমিক ভিত্তি রাষ্ট্র নিজেই ধারণ করে। কিন্তু আমাদের মতো দেশে না আছে পারিবারিক সংবেদনশীলতা, না আছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শক্ত সামাজিক সুরক্ষা।নৈতিকতাহীন আধুনিক শিক্ষা শুধু দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারে, মানবিক মানুষ নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভুল ওষুধ যেমন রোগীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, তেমনি নীতি-নৈতিকতাহীন তথাকথিত উচ্চশিক্ষা আজ সমাজে এক অদৃশ্য বিষবাষ্প তৈরি করছে। যে দেশে বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের সুরক্ষার কোনো আইনি নিশ্চয়তা নেই, যেখানে সন্তানদের কাছে পিতা-মাতা কেবল স্বার্থপর এক সিঁড়ি—সেখানে রাষ্ট্রের এখনই কঠোর নীতিমালা ও বৃদ্ধ বয়সের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। নয়তো সভ্যতার অগ্রযাত্রার নামে আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলব, যা জ্ঞান-বিজ্ঞানে হয়তো আকাশ ছোঁবে, কিন্তু ভেতরের মানবিকতা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
মুহাম্মদ ইয়ার আলী
স্বত্বাধিকারী,
আলী ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবলস কোল্ড স্টোরেজ
কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট।
মনটাকে কাজ দিন
২ দিন আগে
আজব তথ্য
৫ দিন আগে
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ফল কলা কি বিলুপ্তি হয়ে যেতে পারে
১ সপ্তাহ আগে
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কোরআন-হাদিসের সতর্কতা
৩ সপ্তাহ আগে