জলবায়ু পরিবর্তন ও ছত্রাকজনিত রোগের কারণে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ফল কলার উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের বাজারে বহুল প্রচলিত ক্যাভেন্ডিশ জাতের কলা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে প্রাণঘাতী পানামা রোগের নতুন ধরন টিআর৪ (ট্রপিক্যাল রেস ৪)। তবে নতুন প্রজননপ্রযুক্তির অগ্রগতিতে এ সংকট মোকাবিলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
বিশ্বে বছরে প্রায় ১৩ কোটি ৯০ লাখ টন কলা উৎপাদিত হয়। কলার এক হাজারের বেশি জাত থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ক্যাভেন্ডিশ জাত। বিশ্বের বহু দেশে এই জাতের কলাই বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বিপণন করা হয়।
১৯৫০-এর দশকে পানামা রোগের পুরোনো ধরনে আক্রান্ত হয়ে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রোস মিশেল জাতের কলার উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে বাজারে ক্যাভেন্ডিশ জাতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
কিন্তু ক্যাভেন্ডিশ কলার ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় দুর্বলতা। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত এই জাতের গাছগুলো মূলত ক্লোনের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে। ফলে গাছগুলোর জিনগত বৈচিত্র্য খুব কম। একই কারণে কোনো রোগ এ জাতের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠলে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
টিআর৪ রোগে বাড়ছে উদ্বেগ
ক্যাভেন্ডিশ কলার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হলো পানামা রোগের নতুন ধরন টিআর৪। এটি মাটিবাহিত ছত্রাকজনিত রোগ, যা কলাগাছের পানি ও পুষ্টি পরিবহনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করে। আক্রান্ত জমিতে দীর্ঘ সময় ধরে রোগের জীবাণু টিকে থাকতে পারে, ফলে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নরউইচের আর্লহ্যাম ইনস্টিটিউটের ফসলের জিনোমবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. হোসে দে ভেগার মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ছড়িয়ে রোগটি অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছেছে।
গবেষকদের উদ্বেগ, কলার উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার পাশাপাশি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এসব অঞ্চলে অনেক পরিবার খাদ্য ও আয়ের জন্য কলার ওপর নির্ভরশীল।
নতুন জাত উদ্ভাবনে আশার খবর
এই সংকট মোকাবিলায় নতুন অগ্রগতির কথা জানিয়েছে কলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চিকুইটা ও ফসল উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা কি-জিনের যৌথ গবেষণা উদ্যোগ ‘ইয়েলোওয়ে’।
উদ্যোগটির দাবি, তারা প্রজননক্ষম ক্যাভেন্ডিশ কলার একটি জাত উদ্ভাবন করেছে। এর ফলে প্রচলিত সংকরায়ণ পদ্ধতি ব্যবহার করে রোগ প্রতিরোধী এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নতুন জাত উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে বাণিজ্যিক ক্যাভেন্ডিশ কলার প্রজননক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নতুন জাত তৈরির ক্ষেত্রে বড় বাধা। প্রজননক্ষম জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হলে প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, সংকরায়ণের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মে যুক্ত করার সুযোগ বাড়বে।
তবে নতুন এই অগ্রগতি কলার বিলুপ্তির ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। নতুন জাতের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, ফলের গুণমান, উৎপাদনশীলতা ও বাণিজ্যিক উপযোগিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
কলার ভবিষ্যৎ কোন পথে?
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ, একটি নির্দিষ্ট জাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে কলা উৎপাদনে বড় সংকট তৈরি করতে পারে। তাই রোগ প্রতিরোধী নতুন জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি কলার জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, রোগমুক্ত চারা ব্যবহার এবং আক্রান্ত জমি থেকে রোগের বিস্তার ঠেকানোও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকদের নতুন উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে কলা উৎপাদনে রোগের ঝুঁকি কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কলা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, এমনটি নিশ্চিত নয়। বরং প্রচলিত জাতের সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ও রোগ প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনই এখন গবেষণার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কোরআন-হাদিসের সতর্কতা
২ সপ্তাহ আগে
কোরআনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও হালাল উপার্জনের শিক্ষা
২ সপ্তাহ আগে
বড় ভাই? -মোহাম্মদ ইয়ার আলী
৩ মাস আগে