লালমনিরহাট থেকে বুড়িমারী এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট কেটে উঠেছে আরব আলী। গন্তব্য ঢাকা। লম্বা পথ, প্রায় চৌদ্দ ঘণ্টার ক্লান্তিহীন যাত্রা। এতক্ষণ ট্রেনের সিটে একা বসে সে কি করবে, তা ভেবে পায় না। জানালার ধারের আসনে গা এলিয়ে সে বাইরের দিকে উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকে। চোখের সামনে দিয়ে মাঠ-ঘাট, গাছপালা আর দিগন্ত ছুটে চলে পেছনের দিকে। মনের ভেতর তখন ভাবনার অবিরাম আনাগোনা-অসংখ্য দৃশ্য, অসংখ্য কল্পনা পলকে জাগে, আবার পলকেই মিলিয়ে যায় কুয়াশার মতো। মাঝে মাঝে চোখের পাতা ভারী হয়ে তন্দ্রা নেমে আসে। সেই ঝিমুনির ভেতরও নানা অবয়বের স্বপ্ন আর ভাবনা মাথায় জট পাকায়। কিন্তু ঘুম ভাঙতেই সব উধাও; একটি চিন্তার খেইও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ফের চোখ মেলে সে ট্রেনের ভেতরের মানুষ দেখে–কারও ব্যস্ত পদচারণা, কারও অলস বসে থাকা, আবার কোনো ফেরিওয়ালার একটানা হাঁকডাক! সব দেখে, সব শোনে, অথচ কোনো দৃশ্যই তার মনের গভীরে স্থায়ী দাগ ফেলে না। অসংখ্য ভাবনা, স্বপ্ন আর খেয়ালিপনার ভেতর দিয়ে একসময় ট্রেন এসে থামে ইট-পাথরের ঢাকা শহরে।
কমলাপুর রেলস্টেশনে নামতেই শত শত মানুষের হুড়োহুড়ি আর হাঁকডাঁকিতে আরব আলীর আচ্ছন্ন ভাবটা এক লহমায় কেটে যায়। সস্থিত ফিরে পেয়ে তড়িঘড়ি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সে প্ল্যাটফর্মে পা রাখে। এতক্ষণ অলস থাকা মন এবার চঞ্চল হয়ে ওঠে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদে। স্টেশন পেরিয়ে বাইরে এসে একটি রিক্সা ডেকে চেপে বসে সে। কিন্তু অবাক কাণ্ড, সারারাত ট্রেনের জানালার বসে যে হাজারো ভাবনার জাল বুনেছিল, এখন তার একটিও মনে নেই। রিক্সায় যেতে যেতেও তার চোখের দৃষ্টি আর মন থেমে থাকে না। রাস্তার দুই ধারের দালানকোঠা, মানুষজন, চলমান বাস-ট্রাক—সবকিছুই সে দেখে যায়। কিন্তু দেখছে, কি ভাবছে, তার কোনো কুলকিনারা নেই। রাস্তার স্পিডব্রেকারে রিক্সার মৃদু ঝাঁকুনি লাগতে ভাবনা ভাঙে; তখন হয়তো রিক্সাওয়ালাকে সাবধান করে দেয়, "ভাই, একটু দেখেগুনে আস্তে চালান।"
সকাল তখন দশটা। মতিঝিলের এক পরিচিত হোটেলে নাস্তার উদ্দেশ্যে নামে আরব আলী। হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে বসে পরোটা, সবজি আর ডিমের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। এই সামান্য সময়টুকুতেও মন অলস বসে থাকে না। হোটেলের চারপাশ, ব্যস্ত বয়-বেয়ারার ডৌড়াদৌড়ি দেখতে দেখতে সে একের পর এক বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করে। গরম নাস্তা টেবিলে আসতেই শুরু করে খাওয়া। কিন্তু খাওয়ার মাঝেও মনের জল্পনা-কল্পনা থামে না—যে কারিগর পরোটা বানিয়েচে সে হাত ঠিকমতো ধুয়েছিল তো? সবজিটা কি ভালো করে পরিষ্কার করা হয়েছিল? ভাবতে ভাবতেই খাওয়া শেষ হয়। এরপর যখন চায়ের কাপে চুমুক দেয়, তখন আবার নতুন চিন্তা উঁকি দেয়—এই একই কাপে না জানি কত লোক চা খেয়েছে!
বিল চুকিয়ে ব্যাগ হাতে মতিঝিলের অফিসের দিকে হাঁটা দিতেই আগের সব ভাবনা মুহূর্তের মধ্যে উবে যায়। এখন কেবল অফিসের কাজের চিন্তা। নির্দিষ্ট দপ্তরে পৌঁছে কর্মকর্তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা আর নথিপত্র কাজ সারতে সারতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে আসে। যতক্ষণ সে অফিসে কাজে নিবিষ্ট ছিল, ততক্ষণ মনের মধ্যে অন্য কোনো এলোমেলো ভাবনার সুযোগ ছিল না। কিন্তু কাজ শেষ হওয়া মাত্রই অলস মন আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিকেলে সামান্য খেয়ে সে আবারও রিক্সায় চড়ে কমলাপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পথটুকু খুব কম সময়ের হলেও রিক্সায় বসে মনের আনাগোনা চলতে থাকে। রাস্তা পারাপারের মানুষ কিংবা জ্যামে আটকে গাড়ি—সবই চোখে পড়ে, কিন্তু কিছুই স্থায়ী ছাপ ফেলে না।
স্টেশনে পৌঁছে লালমনিরহাট ফেরার টিকিট কেটে প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় পায়চারি করতে থাকে আরব আলী। ট্রেনের তীক্ষ্ণ হুইসেল, মানুষের ছোটাছুটি, ট্রেনের আসা-যাওয়া—সবকিছুই সে দেখে আর শোনে। মন নিজের খেয়ালে একের পর এক কাজ তৈরি করে নেয়, আর শরীরটা কেবল দাঁড়িয়ে থাকে ট্রেনের অপেক্ষায়।
রাত তখন সাড়ে দশটা। প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ায় লালমনিরহাট এক্সপ্রেস। মাইকের ঘোষণার সাথে সাথেই আরব আলীর মাথায় বাকি সব চিন্তা উবে যায়। এখন একটাই তাড়া—দ্রুত বগিতে ওঠা এবং নিজের আসনটি খুঁজে নেওয়া। কামরায় উঠে নির্দিষ্ট আসনে ব্যাগ তুলে রেখে যখন সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, তখন শরীর যেন ক্লান্তির ভারে নুয়ে পড়ল। জানালার ধারের আসনে হেলান দিয়ে সে ভাবল, "যাক, আগামীকাল সহিসালামতে হয়তো বাড়ি পৌঁছাতে পারব।" শরীর যখন পরিশ্রান্ত ও অবসন্ন, মনের তখনো কোনো ক্লান্তি নেই। প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ট্রেন যখন চলতে শুরু করল, বাইরে অন্ধকার ভেদ করে মন আবার ছুটতে লাগল কল্পনার পেছনে। তন্দ্রা আর জাগরণের মাঝামাঝি এক অদ্ভুত আবহে সারারাত কেটে গেল।
পরদিন সকালে লালমনিরহাটে নেমে যখন নিজের বাড়িতে পৌঁছাল, আরব আলী হিসাব করে দেখল—যাওয়া-আসা আর অফিস মিলিয়ে মোট চব্বিশ ঘণ্টা পার হয়েছে। এই পুরো সময়ে বাস্তব কাজ হয়েছে মাত্র দুই ঘণ্টা, আর বাকি বাইশ ঘণ্টাই কেটেছে মনের উদ্দেশ্যহীন ভাবনা, অলীক কল্পনা আর স্বপ্নের পেছনে।
বাড়িতে ফিরে এই বিষয়টি আরব আলীর হৃদয়কে নাড়া দেয়। সে গভীরভাবে ভাবতে থাকে—মন তো কখনো ক্লান্ত হয় না, ক্ষান্ত হয় না, থামতেও চায় না। শরীর ঘুমিয়ে পড়লেও মন তার নিজের মতো কাজ করে যায়। অথচ মৃত্যুর পর হাশরের কঠিন দিনে তো মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব নেওয়া হবে। তাহলে এই যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীন ভাবনা আর কল্পনায় কেটে গেল বাইশ ঘণ্টা, এর কী জবাবদিহিতা হবে? মনের কি তবে কোনো গঠনমূলক ও অর্থপূর্ণ কাজ নেই?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরব আলী পবিত্র কুরআন খুলে বসে। সুরা আলে ইমরানের ১৯০ ও ১৯১ নম্বর আয়াত পড়তে পড়তে তার চোখ আটকে যায়। সেখানে এরশাদ হয়েছে:
"নিশ্চয় আসমান ও যমীনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানবানদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে; যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে (সর্বাবস্থায়) আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা-গবেষণা করে; আর বলে—হে আমাদের পালনকর্তা! আপনি এসব উদ্দেশ্যহীন ও অনর্থক সৃষ্টি করেননি। আপনি পরম পবিত্র, অতএব আপনি আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।"
আয়াতগুলোর মর্মার্থ উপলব্ধি করে আরব আলীর মনের বদ্ধ দুয়ার যেন খুলে গেল। সে বুঝল, আসমান-জমিনের অপার রহস্য আর নিখুঁত শৃঙ্খলার দিকে তাকিয়ে বিশ্বজগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহকে জানা এবং তাঁর অপার কুদরত নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করাই হচ্ছে মনের শ্রেষ্ঠ কাজ। এটি কেবল সাধারণ কোনো চিন্তা নয়, বরং এক মহৎ ও উচ্চপর্যায়ের ইবাদত। বিশাল এই সৃষ্টির প্রতিটি ধূলিকণা যে অনর্থক নয়, বরং মানবজাতির কল্যাণ ও পরম স্রষ্টার পরিচয় প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট হেকমাতে তৈরি—তা উপলব্ধি করা প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ।
মনের আসল খোরাক ও দায়িত্ব খুঁজে পেয়ে আরব আলী গভীর তৃপ্তি অনুভব করল। অর্থহীন জল্পনা-কল্পনায় সময় অপচয় না করে, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সৃষ্টিজগতের নিদর্শনের মাধ্যমে মনকে সর্বদা আল্লাহর স্মরণে ও গবেষণায় নিয়োজিত রাখার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল সে।
মুহাম্মদ ইয়ার আলী
স্বত্বাধিকারী,
আলী ফুডস অ্যান্ড ভেজিটেবলস কোল্ড স্টোরেজ,
কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট।
আজব তথ্য
৩ দিন আগে
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কোরআন-হাদিসের সতর্কতা
৩ সপ্তাহ আগে
কোরআনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও হালাল উপার্জনের শিক্ষা
৩ সপ্তাহ আগে