বাংলাদেশে ক্ষমতাহীন সম্মানিত ব্যক্তিদের মধ্যে আলেম-ওলামারা অন্যতম। মসজিদ, মাদ্রাসা ও ওয়াজ মাহফিলে ধর্মীয় বয়ানের মাধ্যমে তাঁরা মানুষকে নৈতিকতার শিক্ষা দেন, যদিও তাঁদের কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ক্ষমতা নেই। তা সত্ত্বেও সমাজের মানুষের কাছে তাঁদের রয়েছে অগাধ সম্মান। বিপদ-আপদে মানুষ আলেম-ওলামাদের কাছেই দোয়ার জন্য ছুটে যায়; জন্ম থেকে মৃত্যু—জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তাঁদের সহায়তা কামনা করে। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত রাখতে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। সমাজে অন্যান্য পেশা বা শ্রেণির মানুষের নানা দোষত্রুটি প্রকাশ পেলেও আলেমদের ক্ষেত্রে তা সচরাচর দেখা যায় না। ফলে সমাজে সৎ মানুষ হিসেবে তাঁদের বিশেষ সুনাম রয়েছে।
এ দেশের মাদ্রাসাগুলো মূলত আলেম-ওলামা তৈরির প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে আলিয়া ও কওমি—এই দুই ধারার মাদ্রাসা দেশে আলেম তৈরি করে আসছে। আলিয়া ধারার মাদ্রাসাগুলো সরকারি অনুদান পায় এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে এগুলো অনেকটা সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতোই সময়সূচি মেনে চলে। তবে অনেকের মতে, কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার মান বজায় না থাকায় বর্তমানে এই ধারায় পর্যাপ্ত দক্ষ ও বিজ্ঞ আলেম তৈরি হচ্ছে না।
অন্যদিকে, ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের পাঠ্যক্রম অনুসরণে সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয় কওমি মাদ্রাসাগুলো। অতীতে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এড়িয়ে কিংবা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সাথে সরাসরি সংঘাতমুক্ত থেকে কওমি শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে। ফলে দেশে রাজনীতি-নিরপেক্ষ বহু আলেম তৈরি হয়েছেন। সমাজের সচেতন ও উচ্চশিক্ষিত মানুষ এই শিক্ষাকে নিরাপদ মনে করে সেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দান-অনুদানের হাত প্রসারিত করেছেন। এছাড়া আলিয়া ধারায় ধর্মীয় শিক্ষার পর্যাপ্ত গভীরতা না পেয়ে বহু সাধারণ মানুষ সন্তানদের কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে আগ্রহী হন। এর ফলে দেশের গ্রামগঞ্জে কওমি ধারার মাদ্রাসার বিস্তার ঘটেছে। আবার কওমি থেকে পাস করা তরুণদের জন্য সরকারি চাকরির সুযোগ সীমিত থাকায়, কর্মসংস্থানের তাগিদেও অনেকে গ্রামে-মহল্লায় নতুন নতুন মাদ্রাসা ও মক্তব প্রতিষ্ঠা করছেন; ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষও সওয়াবের আশায় সেখানে আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন।
কওমি ধারার এই সম্প্রসারণ এতদিন নির্বিঘ্নেই চলছিল। কিন্তু যখন থেকে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জাতীয় রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় হতে শুরু করেন, তখন থেকেই একটি শ্রেণি তাঁদের প্রতি কঠোর মনোভাব পোষণ করতে থাকে। বিশেষ করে হাফেজ্জী হুজুর, মুফতি ফজলুল হক আমিনী, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, খতিব মাওলানা ওবায়দুল হক এবং পরবর্তী সময়ে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসে। অভিযোগ রয়েছে, একটি ধর্মনিরপেক্ষ পক্ষ আলেমদের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবকে প্রতিহত করতে অতীতে তাঁদের বিরুদ্ধে ‘জঙ্গিবাদ’, ‘তালেবান’ কিংবা ‘মৌলবাদী’ তকমা দিয়ে প্রচার চালিয়েছে।
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বিচ্ছিন্ন কিছু অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক আলেমসমাজ ও কওমি মাদ্রাসার ওপর অপবাদ দেওয়ার এক ধরনের অপচেষ্টা চলছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আলেমসমাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রও কাজ করতে পারে। ব্যক্তিবিশেষের অপকর্ম দিয়ে যদি সামগ্রিক আলেমসমাজকে বিচার করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাবে। এর ফলে মানুষ ধর্মীয় দিকনির্দেশনার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারে, যা প্রকারান্তরে ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপরই আঘাত হানবে। তাই বিচ্ছিন্ন অপরাধের জন্য সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা বা আলেমদের ঢালাওভাবে বিতর্কিত না করে, প্রকৃত অপরাধ ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের সজাগ থাকা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
আশা করি, বিবেকবান ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা বিষয়টি উপলব্ধি করে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন। আমিন।
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কোরআন-হাদিসের সতর্কতা
২ সপ্তাহ আগে
কোরআনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও হালাল উপার্জনের শিক্ষা
২ সপ্তাহ আগে
বড় ভাই? -মোহাম্মদ ইয়ার আলী
৩ মাস আগে