বাবু,রতন, আনিস, দুলাল এরা সবাই কৃষি কামলা/শ্রমিক। দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে সারা বছর মানুষের ক্ষেতে কাজ করে। যখন দৈনিক মজুরি তিনবেলা খাওয়া অথবা দুই বেলা খাওয়া সন্ধ্যায় আধারের চাউল আর পাঁচ টাকা মজুরি ছিল তখন তাদের যে জীবন ধারা ছিলো এবং কর্মঘণ্টা ছিল বর্তমানে কিন্তু তার অনেক পরিবর্তন হয়েছে । এখন তারা দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতে চায় না, কন্ট্রাক্ট ভিত্তিতে কাজ করতে চায় অগত্যা মাঝেমধ্যে দৈনিক মজুরিতে করে নইলে বছরের বেশিরভাগ সময়ই কন্ট্রাক্ট ভিত্তিতে কৃষিকাজ করে থাকে। এর ফলে কৃষকের জীবন ধারায় যে সমস্ত পরিবর্তন এসেছে এবং কৃষি উৎপাদন/বানিজ্যে তার কি প্রভাব পরেছে তার কিছু বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
(১) কৃষকেরা এখন সারা বছর ধরে কাজ করতে চায় না। ঋতু ভিত্তিক কাজ করে অবশিষ্ট সময় অলস ভাবে কাটাতে চাচ্ছে,অর্থাৎ বছরের বেশিরভাগ দিনই তারা কাজ করে না। এতে কৃষির ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
(২) কৃষকেরা দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করার চেয়ে চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করতে বেশি আগ্রহী হয়ে পরেছে। এতে ছোটখাটো কৃষিকাজে কেউ কাজ করতে চাচ্ছে না।ফলে শ্রমিকের অভাবে ছোট ছোট চাষিরা কৃষিকাজ করতে পারছে না। চুক্তির আওতায় কাজের সুবাদে শ্রমিকদের আয় বেড়েছে আর ব্যয় বাড়ছে কৃষি উৎপাদনের। ফলে শ্রমিকরা এখন অতিরিক্ত কাজের চেয়ে বিশ্রাম বা অবসরকে (Leisure) বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। অর্থাৎ পূর্বের মতো ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজের বদলে নির্দিষ্ট সময় (সকাল ৯টা–বিকাল ৪টা) বা আধাবেলা কাজের প্রবণতা বেড়েছে এতে কৃষির ব্যয় ব্যাপক বৃদ্ধি পাচ্ছে।
(৩) গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা পাকা হওয়া এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা/ভ্যানের বিস্তার লাভের সুযোগে কৃষি শ্রমিকরাও শারীরিক বা কায়িক শ্রমের প্রতি অনীহা দেখাচ্ছে এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকছেন এতে কৃষি শ্রমিকের দারুণ সংকট দেখা দিচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদনে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
(৪) কৃষি শ্রমিকরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে কিংবা বাজারের দোকানগুলোতে বেশিরভাগ সময়ই আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছে। তারাই এখন চায়ের দোকানের প্রধান খদ্দের । তারা সেখানে দিনে ১০০-২০০/ টাকা পর্যন্ত চা নাস্তা বাবদ খরচ করে থাকে। এতে শ্রমিকদের শ্রম ঘন্টা যেমন কমে যাচ্ছে তেমনি আয়ের প্রত্যাশাও বাড়ছে এরফলে তাদের সকল চাপ পরছে কৃষি উৎপাদনের উপর এবং কৃষির ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
(৫) কৃষি শ্রমিকদের জীবন যাত্রার ধারায় আধুনিকতা সংযুক্ত হয়েছে। তাদের সবার গায়ে ভালো পোশাক আশাক দেখতে পাওয়া যায়। তাদের ছেলে মেয়েরা স্কুলে লেখাপড়া করছে, কম বেশি সবার ছেলে মেয়েরা কমপক্ষে এসএসসি পাস করছে।
তাদের সকালের নাস্তায় এখন তারা পরোটা রুটি খিচুড়ি ডিম যোগ হয়েছে। তারাও বেশিরভাগ সময় বাড়িতে রান্না করতে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করছে না। কিংবা বাসায় তাদের স্ত্রীরা এখন কাঠখড়িতে রান্না করতে চাচ্ছে না গ্যাসের চুলা কিংবা বিদ্যুৎতে রান্না বান্না করছে। তাদের এ আধুনিকতার সকল অর্থনৈতিক দায় ভার কৃষি উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।
(৬) প্রায় সব কৃষি শ্রমিকদের হাতে চকচকে স্মার্টফোন বা মোবাইল ফোন, বাড়িতে টেলিভিশন আর ফ্রিজ। স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ডাটা ব্যবহার বেড়েছে। এতে যেমন তাদের কাছে তথ্যপ্রবাহ বাড়িয়েছে সচেতনতা, আইন-কানুন বোঝা ও নাগরিক অধিকারবোধ জোরদার হয়েছে। অপরদিকে এসব বিষয়ে মাসে তাদের ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। সবার বাসায় এখন ভালো তরিতরকারির ব্যবস্থা যেমন বয়লার মুরগি,সামুদ্রিক মাছ কিংবা পুকুরের পাঙ্গাস, তেলাপিয়া,আর সিলভারকার্প ইত্যাদি মাছের তরকারি রান্না করা হয়।
(৭) পুর্বে কৃষকদের স্ত্রীরাও অন্যের বাড়িতে কাজ কাম করে সংসারে সহযোগিতা করতো। এখন তার দরকার হচ্ছে না॥ অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বাড়ার কারণে পরিবারের নারীদের অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ বা মাঠে মজুরি খেটে কাজ করার বাধ্যবাধকতা কমেছে। ফলে বাসা বাড়িতে কৃষি পণ্য প্রসেসিং এর সহযোগি হিসেবে নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। সেখানেও কৃষির উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
(৮) বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে অটোরিকশা চালানো, ছোট দোকানদারি, বা শহর/বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতিতে তরল নগদ প্রবাহ বেড়েছে। ফলে শুধু কৃষিকাজের ওপর তাদের একক নির্ভরশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে সবাই রিড়ি টানত এখন অনেকে কমদামি সিগারেট খায়, বেশিরভাগ কৃষকের টিনের বাড়ি টিনের বেড়া আর মেঝে পাকা ,ছেলে মেয়েদের বিয়ে দিতে ৪-৫/ লক্ষ টাকা খরচ করার সামর্থ্য রাখে।
অর্থনীতিতে যখন উদ্বৃত্ত কৃষি শ্রম কমে যায় বা বিকল্প আয়ের পথ তৈরি হয়, তখন কৃষিশ্রমিকের দরকষাকষির ক্ষমতা (Bargaining Power) বাড়ে। এতে শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মজুরি বাড়ে কয়েক গুণ, যা ফসলের মোট উৎপাদন খরচের ৫০–৬০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে। শ্রমের ঘাটতি ও কম কর্মঘণ্টা,সময়মতো এবং কম সময়ে শ্রমিক না পাওয়ায় বীজ বপন ও ফসল কাটার খরচ বাড়ছে। অপরদিকে পণ্যের ন্যায্যমূল্যের অভাব,শ্রম ও সারের ও কীটনাশক ঔষধের পেছনে যে হারে ব্যয় বেড়েছে, বাজারে ধান, আলু বা অন্যান্য কৃষিপণ্যের বিক্রয়মূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনি। এছাড়াও ফসল কেনাবেচায় মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজারের দুর্বলতার বাড়তি খরচের বোঝা বহন করতে হচ্ছে কৃষকদেরকেই।
অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি "উচ্চ মধ্যম-আয়ের উত্তরণকালীন চাপ" (Transitional Pressure)—যেখানে শ্রমিকের সামাজিক উন্নয়ন ঘটলেও, কৃষি খাত যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যাপকভাবে যান্ত্রিকীকরণ (Mechanization) ও বাজার কাঠামোর আধুনিকায়নে রূপ না নিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ কৃষিকাজ লাভজনক করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিতে বাবু, রতন, আনিস বা দুলালদের মতো কৃষি শ্রমিকদের জীবনধারার এ পরিবর্তনকে মূলত "উন্নয়ন অর্থনীতি" (Development Economics), "শ্রম অর্থনীতি" (Labour Economics) এবং সামগ্রিক সামাজিক রূপান্তর (Structural Transformation)-এর দৃষ্টিকোণ থেকে পরিমাপ ও বিশ্লেষণ করা হয়।
লেখক মুহাম্মদ ইয়ার আলী
স্বত্বাধিকারী
আলীবাবা থিম পার্ক
কেন কৃষি লাভজনক হচ্ছে না? ( পর্ব-১ )
৫ দিন আগে
নেতা দেশ প্রেমিক কি না যাচাই করার উপায়
২ সপ্তাহ আগে
কিস্তির বেড়াজালে গ্রাম
৩ সপ্তাহ আগে
লালমনিরহাট জেলা-শিল্প উন্নয়নে বাধা-২
৪ সপ্তাহ আগে