তিস্তা নদীর তীর ঘেঁষে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সম্ভাবনাময় জেলা লালমনিরহাট। ভৌগোলিকভাবে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে অবস্থান করলেও শিক্ষা, মেধা, পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী চিন্তায় এ জেলার তরুণরা কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, ব্যবসা, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে লালমনিরহাটের তরুণরা নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। তবে এই সম্ভাবনাকে আরও বড় শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ। বিশেষ করে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, প্রয়োজন ব্যবহারিক দক্ষতা
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। চাকরির বাজার থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্র সবখানেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ছে। ইংরেজি ভাষা, যোগাযোগ দক্ষতা, কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপাত্ত বিশ্লেষণ, ডিজিটাল বিপণন, গ্রাফিক নকশা, অনলাইন স্বাধীন পেশা, দূরবর্তী চাকরি ও উদ্যোক্তা দক্ষতা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা। কিন্তু শহর ও গ্রামের সুযোগের মধ্যে এখনও বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। লালমনিরহাটের অনেক মেধাবী তরুণ শুধু সুযোগ ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে নিজেদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছেন না। তাই জেলা পর্যায়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে একজন তরুণ নিজের জেলা থেকেই আধুনিক বিশ্বের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।
জেলা পর্যায়ে তরুণ দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র
লালমনিরহাট জেলায় একটি আধুনিক “তরুণ দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র” প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এর অধীনে প্রতিটি উপজেলায় “ডিজিটাল দক্ষতা কেন্দ্র” স্থাপন করা সম্ভব। এসব কেন্দ্রে স্বল্প খরচে বা বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ইংরেজি, যোগাযোগ দক্ষতা, ডিজিটাল বিপণন, গ্রাফিক নকশা, অনলাইন স্বাধীন পেশা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপাত্ত বিশ্লেষণ ও অন্যান্য কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তরুণদের অনলাইন স্বাধীন পেশা ও দূরবর্তী চাকরির জন্য বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ, কাজের নমুনা বা পেশাগত পরিচিতি তৈরি, অনলাইন কর্মবাজার ব্যবহারের কৌশল এবং কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি দেওয়া প্রয়োজন।
প্রয়োজন পেশা-পরামর্শ ও পরামর্শদাতা নেটওয়ার্ক
অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পরও জানেন না কোন বিষয়ে পড়বেন, কোন পেশায় গেলে ভবিষ্যৎ ভালো হবে কিংবা উচ্চশিক্ষার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। ফলে অনেকেই অন্যের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে পেশা বেছে নেন। এ সমস্যা সমাধানে স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই “পেশা-পরামর্শ ও পরামর্শদাতা নেটওয়ার্ক”চালু করা যেতে পারে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত, বিভিন্ন পেশায় কর্মরত এবং সফল উদ্যোক্তা লালমনিরহাটের তরুণদের নিয়ে একটি পরামর্শদাতা দল গড়ে তোলা যেতে পারে। তারা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলবেন, পেশা নিয়ে পরামর্শ দেবেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবেন।
পাঠাভ্যাস, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় গুরুত্ব দিতে হবে
দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক পাঠাগার, ডিজিটাল গ্রন্থাগার এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষামুখী না করে বই পড়া, বিতর্ক, গবেষণা, বিজ্ঞানচর্চা, লেখালেখি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রতিবছর বইপড়া প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান মেলা ও গবেষণা উপস্থাপনার আয়োজন করা যেতে পারে।
চাকরিপ্রস্তুতির পাশাপাশি তৈরি হোক উদ্যোক্তা
তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে তৈরি করলে চলবে না; তাদের চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে লালমনিরহাটে “উদ্যোক্তা বিকাশ ও সহায়তা কেন্দ্র”প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, ব্যবসায়িক পরামর্শ, প্রাথমিক অর্থায়ন, বাজারসংযোগ এবং ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারে সহযোগিতা দেওয়া প্রয়োজন। লালমনিরহাটের স্থানীয় পণ্য, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে কেন্দ্র করে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির বড় সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় পণ্যকে কেন্দ্র করে অনলাইন বাণিজ্য ও ডিজিটাল বিপণন কার্যক্রম গড়ে তুললে একদিকে উদ্যোক্তা তৈরি হবে, অন্যদিকে জেলার পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। স্থানীয় ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, এনজিও, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার্থী ও তরুণদের শিল্প ও কর্মক্ষেত্রভিত্তিক সংযোগ তৈরি করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণকালীন কর্মঅভিজ্ঞতার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিবছর “চাকরি ও প্রশিক্ষণকালীন কর্মসুযোগ মেলা” আয়োজন করা যেতে পারে। এতে একদিকে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী খুঁজে পাবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা সরাসরি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাবেন।
তরুণীদের জন্য বিশেষ দক্ষতা কর্মসূচি
লালমনিরহাটের উন্নয়নে নারী তরুণীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, ইংরেজি ভাষা, অনলাইন কাজ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ডিজিটাল বিপণন ও নেতৃত্ব বিকাশে তরুণীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। একজন দক্ষ তরুণী শুধু নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করেন না; তিনি পরিবার ও সমাজের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বাড়াতে পারেন।
নেতৃত্ব, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড
শুধু একাডেমিক বা চাকরিমুখী দক্ষতা নয়, তরুণদের নেতৃত্বের গুণাবলি ও সামাজিক দায়িত্ববোধও গড়ে তুলতে হবে। এজন্য নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি, বিতর্ক, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞানচর্চা এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমে তরুণদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। জেলার বিভিন্ন ছাত্র, যুব ও সামাজিক সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় করে একটি সমন্বিত “তরুণ প্ল্যাটফর্ম” গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একই ধরনের কর্মসূচির পুনরাবৃত্তি কমবে এবং সীমিত সম্পদকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
প্রতিবছর হতে পারে “লালমনিরহাট তরুণ সম্মেলন
জেলার তরুণদের নিয়ে প্রতিবছর “লালমনিরহাট তরুণ সম্মেলন” আয়োজন করা যেতে পারে। সেখানে শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি, নেতৃত্ব ও সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হবে। এই সম্মেলনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, চাকরিজীবী, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠনের প্রতিনিধিদের এক প্ল্যাটফর্মে আনা যেতে পারে। এর মাধ্যমে জেলার তরুণদের সমস্যা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ তৈরি করা সম্ভব হবে।
সব উদ্যোগকে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা না করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। এজন্য জেলা পর্যায়ে “লালমনিরহাট তরুণ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। এই পরিকল্পনার আওতায় আরও থাকতে পারে—
* অনলাইন স্বাধীন পেশা ও দূরবর্তী চাকরির প্রস্তুতি
* ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়ন
* চাকরি ও প্রশিক্ষণকালীন কর্মসুযোগ মেলা
* উদ্যোক্তা বিকাশ ও সহায়তা কেন্দ্র
* স্থানীয় পণ্যের অনলাইন বাণিজ্য ও ডিজিটাল বিপণন
* কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদভিত্তিক উদ্যোক্তা উন্নয়ন
* নারী তরুণীদের জন্য বিশেষ দক্ষতা কর্মসূচি
* বিতর্ক, বইপড়া, গবেষণা ও বিজ্ঞানচর্চা
* খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
* স্বেচ্ছাসেবা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড
* মেধাবী শিক্ষার্থীদের তথ্যভান্ডার
* দরিদ্র মেধাবীদের বৃত্তি ও শিক্ষা সহায়তা
* সমন্বিত তরুণ প্ল্যাটফর্ম
* প্রতিবছর “লালমনিরহাট তরুণ সম্মেলন”
সমন্বিত উদ্যোগই পারে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, এনজিও, ব্যবসায়ী, প্রবাসী, সাবেক শিক্ষার্থী এবং ছাত্র-যুব সংগঠনগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের পক্ষে এত বড় উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন অংশীদারত্ব, সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লালমনিরহাটের তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, চাকরি সৃষ্টিকারী, উদ্ভাবক ও নেতৃত্বদানে সক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা, নেতৃত্ব, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের চর্চা বাড়াতে হবে।
লালমনিরহাটের তরুণদের মেধা ও সম্ভাবনা কোনো অংশেই কম নয়। প্রয়োজন শুধু সঠিক সুযোগ, প্রশিক্ষণ, দিকনির্দেশনা ও একটি সহায়ক পরিবেশ। আজকের একজন দক্ষ তরুণ আগামী দিনের উদ্যোক্তা, শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক কিংবা জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে আসতে পারেন। একটি জেলার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মাটি, স্থাপনা কিংবা অবকাঠামো নয়, বড় সম্পদ হলো তার মানুষ। আর সেই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শিক্ষিত, দক্ষ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল তরুণ প্রজন্ম। তাই লালমনিরহাটের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে অবকাঠামোর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
লালমনিরহাটের তরুণদের জন্য সুযোগ তৈরি করা মানেই লালমনিরহাটের ভবিষ্যৎ তৈরি করা। এখনই সময় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার।
লেখকঃ সৈকত রায়হান শাওন,
শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিক
দপ্তর সম্পাদক, ঢাকাস্থ লালমনিরহাট জেলা ছাত্রকল্যাণ পরিষদ