মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

বাংলাদেশে টনে টনে ভারতীয় ইলিশ, কেন বাড়ছে আমদানি?


প্রকাশ : (৩ ঘন্টা আগে)
বাংলাদেশে টনে টনে ভারতীয় ইলিশ, কেন বাড়ছে আমদানি?

একসময় বাংলাদেশ থেকে বিদেশে ইলিশ রপ্তানি হতো। অথচ এখন সেই বাংলাদেশেই ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমদানি হচ্ছে। গত দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কেজি বা ৩৫০ টনের বেশি ইলিশ দেশে ঢুকেছে। আমদানির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

যশোর জেলা মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে ১৯টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে। এসব মাছের আমদানি মূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা।

মৎস্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি করা ইলিশের বড় অংশই ভারতের গুজরাত থেকে আসছে। পশ্চিমবঙ্গ হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে এসব মাছ বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

কম দামে ইলিশ, বাড়ছে আমদানির আগ্রহ

বাংলাদেশের বাজারে ইলিশের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় আমদানিতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভারত থেকে কম দামে মাছ কিনে শুল্ক ও অন্যান্য খরচ যোগ করার পরও বাংলাদেশের বাজারদরের তুলনায় তা সস্তা পড়ে।

একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মো. কামরুজ্জামান বলেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় ব্যবসায়ীরা আমদানির দিকে ঝুঁকছেন। লাভের সম্ভাবনা থাকায় তারা সরকারি অনুমতি নিয়ে মাছ আনছেন।

যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুল মামুন বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইলিশ আমদানি করছে। তবে কেন আমদানি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তাদের নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক জানান, ব্যবসায়ীদের আবেদনের ভিত্তিতে সীমিত পরিসরে ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইলিশ আমদানি নিষিদ্ধ নয় এবং আগেও বিভিন্ন সময়ে অল্প পরিমাণে এই মাছ দেশে এসেছে।

দেশে ইলিশ কমছে কেন?

বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে ইলিশ উৎপাদন কমে আসছে। সরকারি হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে হয় ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন।

চলতি অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব এখনও পাওয়া না গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে নেমে যেতে পারে।

ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান মনে করেন, নদী দূষণ, জাটকা নিধন, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ ধরা এবং ইলিশের চলাচলের পথ বা অভিবাসনপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে দেশে ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহে প্রভাব পড়ছে।

তার মতে, ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার পরিবেশ রক্ষা করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

গুজরাতে এবার ইলিশের জোগান বেশি

পশ্চিমবঙ্গের মাছ রপ্তানিকারক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদের দাবি, চলতি মৌসুমে গুজরাতে ইলিশের উৎপাদন বেশি হওয়ায় সেখানে মাছের উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। ফলে দামও তুলনামূলক কম। সেই মাছই পশ্চিমবঙ্গের বাজার হয়ে বাংলাদেশে আসছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে রপ্তানি হয়েছে। এর অধিকাংশই গুজরাতের মাছ।

গুজরাতের ভারুচ থেকে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার পাইকারি বাজার হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত পর্যন্ত এই বাণিজ্যিক পথ তৈরি হয়েছে। বড় চালান সাধারণত হিমায়িত ট্রাকে এবং তুলনামূলক ছোট চালান অন্য পরিবহন ব্যবস্থায় পাঠানো হচ্ছে।

গুজরাতের ভাদভূত এলাকায় নর্মদা নদী সাগরে মিশেছে। এ অঞ্চলসহ জম্বুসার ও হানসোট এলাকায় ইলিশের উৎপাদন হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, গত কয়েক বছর ধরে সেখানে ইলিশের উৎপাদন ভালো হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশের বাজারে ইলিশের সংকট

ঢাকার বিভিন্ন বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে ৫০০ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশ প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা, ৭০০ গ্রামের মাছ প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের মাছ ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকা বা তার কাছাকাছি দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

এই উচ্চমূল্যের বাজারে তুলনামূলক কম দামের ভারতীয় ইলিশ ব্যবসায়ীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের কয়েকজনের দাবি, আমদানি করা মাছ দেশে আনার পরও দেশি ইলিশের তুলনায় কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে।

তবে বাজারে ভারত থেকে আসা ইলিশকে বাংলাদেশের মাছ হিসেবে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। এতে ক্রেতারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রকৃত উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন না।

রপ্তানিকারক থেকে আমদানিকারক বাংলাদেশ

ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম প্রধান দেশ বাংলাদেশ। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের বড় একটি অংশ আসে এই মাছ থেকে। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বাড়ার পর সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারায় ছেদ পড়েছে।

অন্যদিকে গত অর্থবছরে ইলিশ রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। প্রায় ১১০ টনেরও কম ইলিশ রপ্তানি হয়েছে, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ টন।

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২০২০ সালে ছয় বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রকল্পটি কতটা কার্যকর হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক।

তার মতে, দেশের ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। পাশাপাশি ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। সুত্র-বিবিসি বাংলা

বিজ্ঞাপন