মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

জ্বালানি আমদানিতে ৭৮ শতাংশ কার্যাদেশ, পুরোনো ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন


প্রকাশ : (১ দিন আগে)
জ্বালানি আমদানিতে ৭৮ শতাংশ কার্যাদেশ, পুরোনো ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন

সরকার পরিবর্তনের পর জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণে পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি আমদানিতে পুরোনো একটি ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব রয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিপিসির দরপত্র, কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত কয়েকটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকারীর স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিপিসি জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ৫৫ লাখ ১০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির কার্যাদেশ দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ লাখ টন জ্বালানির কার্যাদেশ এমন প্রতিষ্ঠান পেয়েছে, যাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ ডা. এজাজুর রহমানের মালিকানাধীন সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। এই পরিমাণ মোট কার্যাদেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ।

বিপিসির নথি অনুযায়ী, পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত ১১টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ছয়টির স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক সংযোগ এজাজ-সংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রয়েছে বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

সেভেন মার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড এবং ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু। অন্যদিকে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভিটল এশিয়া ও সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনাল অয়েলের নাম।

তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ পাওয়ার পরিমাণ বেশি হওয়াই অনিয়মের প্রমাণ নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি ক্রয়ে দাম, গুণগত মান, সরবরাহ সক্ষমতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা ও দরপত্রের শর্তসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, জ্বালানি আমদানিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ কতটা উন্মুক্ত ছিল এবং সীমিত সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতার কারণে কোনো ঝুঁকি তৈরি হয়েছে কি না।

তিন প্যাকেজে একই বলয়ের সংশ্লিষ্টতা

জুন থেকে আগস্ট মেয়াদের একটি দরপত্রের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, চারটি প্যাকেজে ৯ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১১ লাখ ৫০ হাজার টন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয় বিপিসি।

পিজি-১ প্যাকেজে ৩ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ইউনিপেক সিঙ্গাপুর।

পিজি-২ প্যাকেজে ৩ লাখ থেকে ৩ লাখ ৪০ হাজার টন ডিজেল এবং ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া।

পিজি-৩ প্যাকেজে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টন ফার্নেস অয়েলের কার্যাদেশ পায় ট্রাফিগুরা। আর পিজি-৪ প্যাকেজে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টন অকটেন সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া।

এই চার প্যাকেজের তিনটির কার্যাদেশ পাওয়া ইউনিপেক ও ভিটল এশিয়ার স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব এজাজ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্যাকেজে সম্ভাব্য মোট আমদানি ব্যয় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বাড়ছে প্রিমিয়াম, উঠছে প্রশ্ন

জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারদরের পাশাপাশি পরিবহন, বীমা, জাহাজভাড়া ও অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয়। সাম্প্রতিক দরপত্রে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে জুন মেয়াদের উন্মুক্ত দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ৭২ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ৬ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়ামে কার্যাদেশ পেয়েছিল। একই সময়ে ভিটল এশিয়ার প্রিমিয়াম ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৭৮ ও ৬ দশমিক ৮৮ ডলার।

পরবর্তী জুন থেকে আগস্ট মেয়াদের দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ১৩ দশমিক ২৫ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ১৪ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়াম প্রস্তাব করে। ভিটল এশিয়ার প্রস্তাব ছিল যথাক্রমে ১৩ দশমিক ১৮ ও ১৪ দশমিক ৭৮ ডলার।

বিপিসিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়ায় এ সময়ে প্রিমিয়াম বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে সরবরাহকারীর সংখ্যা ও প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতা প্রিমিয়াম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি

বিপিসির নথি অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা দুটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী নির্ধারিত কিছু জ্বালানি সরবরাহে অপারগতা জানিয়েছিল। বিষয়টি বিপিসির বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতেও উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমিতসংখ্যক সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সংকটের সময় ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কয়েকটি সরবরাহকারী একই সময়ে সরবরাহ থেকে পিছিয়ে গেলে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সাবেক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন

এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিপিসি ও এর অধীন তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও অনুসন্ধানে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিপিসি ও তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১০ জন সাবেক কর্মকর্তা অবসরের পর এজাজের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছেন।

তাঁদের কেউ তেল ক্রয়-বিক্রয়, কেউ বিপণন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ কিংবা প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন। যমুনা অয়েল কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহীও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিপিসির ঢাকা লিয়াজোঁ কার্যালয় যে ভবনে, একই ভবনে এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যালয় রয়েছে বলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে।

অবসরপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিলেই তা অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবে তাঁদের আগের দায়িত্ব, বর্তমান প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা এবং বিপিসির সঙ্গে চলমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে স্বার্থের সংঘাতের কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রশ্ন

এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিনকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জি-টু-জি পদ্ধতিতে সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেছিল কি না, তা নিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের নথিতে বিপিসির জন্য প্রতিষ্ঠানটির নামে আসা কয়েকটি জ্বালানি চালান ইন্দোনেশিয়া থেকে নয়, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বন্দর থেকে এসেছে বলে জানা গেছে। তবে তৃতীয় দেশের বন্দর ব্যবহার করে পণ্য সরবরাহ করা নিজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্তির সময় প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছিল কি না এবং সে বিষয়ে কী ধরনের নথি জমা দেওয়া হয়েছিল।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, কোনো ব্যক্তি দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে প্রতিযোগিতায় হস্তক্ষেপ করলে সেটি গুরুতর বিষয়। অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সরবরাহের উৎস বাড়ানো, দরপত্র প্রক্রিয়ায় আরও বেশি প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং সরবরাহকারীদের যোগ্যতা নিয়মিত যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে জ্বালানি আমদানিতে নির্দিষ্ট একটি ব্যবসায়ী বলয়ের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। সরবরাহকারী নির্বাচন, দরপত্রের প্রতিযোগিতা, প্রিমিয়াম নির্ধারণ এবং সাবেক কর্মকর্তাদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।

বিজ্ঞাপন