রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্তে একাধিক তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশ বলছে, মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তবে তদন্তে জমি কেনাবেচা ও টাকা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ফলে পুলিশের পক্ষ থেকে হত্যার কারণ সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়া হলেও ঘটনার নেপথ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন এখনো রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তরের মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, ময়নাতদন্তে চারজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। তার দাবি, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস পরিবারের চার সদস্যকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে।
পুলিশ কমিশনার জানান, গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন। তদন্তে পাওয়া তথ্য, আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে পুলিশের তদন্তে শুধু মাদক নিয়ে বিরোধই নয়, জমি কেনাবেচা সংক্রান্ত বিষয়ও সামনে এসেছে। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ দাসের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে গণপতি চক্রবর্তী জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। ওই জমি বেশি দামে বিক্রি করা এবং বিক্রির টাকা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আনুপাতিক হারে ভাগ না হওয়া নিয়ে ক্ষোভ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিকে ময়নাতদন্তে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, মরদেহ থেকে নেওয়া নমুনা পরীক্ষাতেও ধর্ষণের পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, চারজনের গলায় দাগ পাওয়া গেছে এবং সবার মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। মরদেহে আঘাতের চিহ্ন থাকলেও কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাটা বা ছেঁড়ার দাগ পাওয়া যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মরদেহের মুখে পোড়া দাগের যে দাবি ছড়িয়েছে, সেটিও সঠিক নয় বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডের পর গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদ পানি দিয়ে ধুয়ে আলামত নষ্ট করার অভিযোগও উঠেছে। নিহত পরিবারের বাড়ির দায়িত্বে থাকা পুলিশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেন গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের পরিবারের সদস্যরা। তবে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ভুল করে মোটরের সুইচ চালু হয়ে যাওয়ায় ট্যাংকের পানি উপচে ছাদে পড়ে। আলামত নষ্ট করার অভিযোগ সঠিক নয়।
এদিকে মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে সীমান্ত চন্দ্র দাস আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বন্ধু। তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, সীমান্তের দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে গ্রেপ্তার দুই আসামির জবানবন্দির মিল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের রাতে সীমান্তের বাসায় ইয়াবা সেবনের বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে মিল রয়েছে।
গ্রেপ্তার দুই আসামির ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্টের জন্য আদালতে আবেদন করবে পুলিশ। তদন্তে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য ও আলামত যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তবে এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিভিন্ন মহলের ব্যক্তিরা। বুধবার সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানববন্ধন ও সমাবেশ করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির নেতারা পুলিশের বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে নেপথ্যে আর কেউ জড়িত কি না, তা খুঁজে বের করার দাবি জানান।
এদিকে বৃহস্পতিবার রংপুরে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার চার খুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এত বড় হত্যাকাণ্ডের পরও সঠিক ক্লু বের করতে গোয়েন্দা সংস্থা ব্যর্থ হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি। তিনি দ্রুত হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের শনাক্ত করার দাবি জানান।
প্রসঙ্গত, রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় গত শনিবার রাতে নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
দুই ছেলে কীভাবে চারজনকে হত্যা করল? পেছনে আরও কেউ নেই তো? মুগ্ধ-সিদ্ধার্থের মা-বাবাদের প্রশ্ন
৩ দিন আগে
রাজারহাটে মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও দৃশ্যমান হয়নি কালভার্ট
১ সপ্তাহ আগে