বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দলটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পদটি শূন্য হয়ে পড়েছে। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও এখনো তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থাকায় বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির চাপ তৈরি হয়েছে বিএনপির ওপর।
দলীয় দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর ভাষ্য, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও বাস্তব সংকট তৈরি হয়েছে নির্বাচনী প্রচারসামগ্রী ঘিরে। ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, লিফলেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত ডিজিটাল পোস্টারে কার ছবি থাকবে—এই প্রশ্নে দল এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে।
দীর্ঘদিন নানা জটিল রোগে ভুগে গত ৩০ ডিসেম্বর সকাল ছয়টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খালেদা জিয়া। তার মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে। তফসিল ঘোষণার আগেই বিএনপির অনেক প্রার্থী প্রচারসামগ্রী ছাপিয়েছেন, যেগুলোর বড় অংশেই রয়েছে খালেদা জিয়ার ছবি। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সেই বাস্তবতা বদলে গেছে।
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা–২০২৫–এর বিধি ৭(চ) অনুযায়ী, দলীয় মনোনয়নে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থী কেবল বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করতে পারবেন। ছবিটি পোর্ট্রেট আকারে হতে হবে এবং নেতৃত্বদান বা বিশেষ ভঙ্গিমায় ব্যবহার করা যাবে না। এই বিধির আলোকে বিএনপির প্রার্থীরা এখন দ্বিধায় পড়েছেন—দলীয় প্রধান হিসেবে কার ছবি ব্যবহার করা যাবে।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তারেক রহমান দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকায় বাস্তবে এখনো ‘চেয়ারম্যান’ পদবি ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে নির্বাচনী প্রচারে সিদ্ধান্তহীনতা থেকেই যাচ্ছে।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও কৌশলগত কারণে বিষয়টি আপাতত প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না। তবে বাস্তবে দলের সব সিদ্ধান্ত, দিকনির্দেশনা ও নির্বাচনী কৌশল নির্ধারিত হচ্ছে তারেক রহমানকে কেন্দ্র করেই। সময় উপযোগী হলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও আসবে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচনী পোস্টারে দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট করতে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। শিগগিরই কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
রাষ্ট্রীয় তিন দিনের শোক শেষে বর্তমানে বিএনপির সাত দিনের শোক কর্মসূচি চলছে, যা শেষ হবে ৫ জানুয়ারি। দেশজুড়ে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এই শোকের আবহেই দলকে এগোতে হচ্ছে নির্বাচনী প্রস্তুতির পথে।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমরা এখনো গভীর শোকের মধ্যে আছি। মন থেকে নির্বাচনী কাজে উৎসাহ পাওয়া কঠিন। তবু যতটুকু সম্ভব, তা করতে হচ্ছে।’
দলীয় সূত্র জানায়, শোক কর্মসূচি শেষ হলেই পূর্ণমাত্রায় নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হবে। অনেক নেতা-কর্মীর মতে, শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও খালেদা জিয়াই এবারের নির্বাচনী প্রচারের আবেগী কেন্দ্র হয়ে থাকবেন। তার জানাজা ও অন্তিম বিদায়ে মানুষের বিপুল উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক মহলের শ্রদ্ধাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার কৌশলেই এগোতে চায় দল।
এ লক্ষ্যে প্রার্থীদের মাঠে সক্রিয় করা, স্থানীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা, জনসভা, উঠান বৈঠক ও ব্যক্তি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ নেতা বলেন, ভোটের মাঠে দলের বার্তা হবে—খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তার আদর্শ, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব বিএনপির রাজনীতিতে জীবিত।
ইতিমধ্যে নির্বাচন পরিচালনা ও কৌশল বাস্তবায়নের জন্য ৪১ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রার্থী ব্যবস্থাপনা, বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ, সাংগঠনিক সমন্বয় ও প্রচারের দিকনির্দেশনা দেখবে এই কমিটি।
তবে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী ইস্যু। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শতাধিক আসনে একাধিক নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এরই মধ্যে রুমিন ফারহানা, সাইফুল আলম (নীরব), হাসান মামুনসহ নয়জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় নির্দেশ অমান্য করলে বহিষ্কারের তালিকা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে সূত্র।
দলীয় নেতৃত্বের মতে, শরিকদের ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, যারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন, তাদের ক্ষেত্রে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
দলের নেতারা মনে করছেন, খালেদা জিয়াকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা এখন বিএনপির ওপর আরও বেড়েছে। সামনে রয়েছে মনোনয়ন বাছাই ও আপিল, প্রার্থিতা প্রত্যাহার, প্রতীক বরাদ্দ ও ইশতেহার চূড়ান্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। লক্ষ্য একটাই—ভোটারদের কাছে কোনো বিভ্রান্তিকর বা অপ্রত্যাশিত বার্তা না যাওয়া।
দলীয় সূত্র আরও জানায়, নির্বাচনী প্রচারের শেষ ধাপে সরাসরি মাঠে নামবেন তারেক রহমান। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং দেশব্যাপী সফরের পরিকল্পনাও করতে পারেন।