রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ খেলা

লালমনিরহাটের ক্রিকেটের নেপথ্য কারিগর: জিকরুল ইসলাম ফাতেমী (নিকেল)


প্রকাশ :

জিকরুল ইসলাম ফাতেমী (নিকেল) লালমনিরহাটের ক্রিকেট অঙ্গনের এক সুপরিচিত ও সম্মানিত নাম। দীর্ঘদিনের খেলোয়াড়ি জীবন পেরিয়ে তিনি কোচ, মেন্টর, ট্যালেন্ট হান্টার-সিলেক্টর, আম্পায়ার ও সংগঠক হিসেবে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

১৯৮৮ সালে তার ক্রিকেটার হিসেবে অভিষেক হয়। তিনি অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় ক্রিকেট, অনূর্ধ্ব-১৮ যুব ক্রিকেট এবং সিনিয়র ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে জেলা দলের ওপেনার ব্যাটার ও উইকেটকিপার হিসেবে খেলেছেন। ডিএসএ ১ম বিভাগ ক্রিকেট লিগে ‘অভিযান ক্লাব’-এর হয়ে খেলেছেন এবং ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে দলটি একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

১৯৯৫ সালে ঢাকায় বিসিসিবির মাসব্যাপী কোচেস কোচিং কোর্স সম্পন্ন করার পর থেকেই তিনি কোচ হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে আম্পায়ার্স কোর্স, ২০০০ ও ২০১০ সালে লেভেল-১ কোচেস কোর্স এবং ২০১২ সালে ফিটনেস কোর্স সম্পন্ন করেন। দেশি-বিদেশি কোচদের সান্নিধ্যে নিজেকে ক্রমাগত দক্ষ করে তোলেন।

জাতীয় মানের ক্রিকেটার তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “লালমনিরহাট ক্রিকেট একাডেমি”। এখানে বোলিং মেশিন, মিনি ইনডোর জিমনেসিয়ামসহ আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা গড়ে তোলা হয়। গত ১৭ বছরে এই একাডেমি থেকে হাজারেরও বেশি ক্রিকেটার তৈরি হয়েছে, যারা স্থানীয় ক্লাব ক্রিকেট, বয়সভিত্তিক জেলা ও বিভাগীয় দল হয়ে জাতীয় পর্যায়েও অংশগ্রহণ করছে।

প্রতিবছর তিনি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায় থেকে ক্ষুদে প্রতিভা খুঁজে বের করে জেলা ক্রিকেট দলে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং তাদের ধারাবাহিকভাবে গড়ে তুলে বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করেন। এই নিয়মিত ট্যালেন্ট হান্ট প্রক্রিয়াই লালমনিরহাটের ক্রিকেট উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

এছাড়া অনেক খেলোয়াড় ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, ১ম, ২য় ও ৩য় বিভাগ লিগসহ দেশের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে।

২০১৫ সাল থেকে তিনি বিসিবির সহকারী জেলা ক্রিকেট কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার হাত ধরে উঠে এসেছে বহু প্রতিভাবান ক্রিকেটার। বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলেছে—জাহাঙ্গীর আলম ডন (অনূর্ধ্ব-১৪), মিজবাউল হক (অনূর্ধ্ব-১৭), মোস্তাফিজুর রহমান লিপু (এশিয়া কাপ), মুশফিক হাসান (অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ), স্বাধীন ইসলাম (অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ)। এছাড়া সীমান্ত রায় রিংকু (অনূর্ধ্ব-১৫) ও আব্দুল আল মিরাজ (অনূর্ধ্ব-১৫) জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছে।

২০২৪ সালের YCL-এ লালমনিরহাটের ৪ জন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করে। একই বছরে অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন রংপুর বিভাগের দলে লালমনিরহাটের ৪ জন খেলোয়াড় ছিল। তাদের মধ্যে রিংকু ৭ ম্যাচে ৩৩ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ও সেরা পেস বোলার হয়।

লালমনিরহাটের ক্রিকেট ইতিহাসে ২০০৯ সালের LPL ও ২০১০ সালের ‘কম্পিউটার কাপ’ টুর্নামেন্ট ব্যর্থতার স্মৃতি এখনও রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালে তিনি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ১৬টি দল নিয়ে সফলভাবে আয়োজন করেন “এলসিএ টি-২০ ক্রিকেট লীগ”।

এছাড়া তার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে—অনূর্ধ্ব-১৫ একাডেমি কাপ, অনূর্ধ্ব-১৪/১৬/১৮ বয়সভিত্তিক ৯টি দল নিয়ে ৬ মৌসুমের “প্রমিজিং ক্রিকেটার্স লীগ”, ২ মৌসুমের “আম্পায়ার্স মেমোরিয়াল টি-২০ লীগ” এবং “চিত্তরঞ্জন দেব স্মৃতি টি-২০ টুর্নামেন্ট”।

নারী ক্রিকেট উন্নয়নেও তার অবদান অনস্বীকার্য। ২০০৯ সালে ১ম জাতীয় নারী ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপে শক্তিশালী জেলা দল গঠন করে সাবেক জাতীয় দলের ভাইস ক্যাপ্টেন সাথিরা জাকির জেসির নেতৃত্বে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেন এবং পরের বছর রানারআপ হয়। সেই খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট সরকারি গার্লস স্কুল দল পরপর তিনবার জাতীয় স্কুল ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হয়।

২০১৫ সালে নারী ক্রিকেটারদের নিয়ে ৪টি দল গঠন করে আয়োজন করেন “প্রমিলা ক্রিকেট লীগ”। ২০১৮ সালে ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের জাতীয় দলের তারকা খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণে ৬ দলের একটি আন্তর্জাতিক টি-২০ ক্রিকেট লীগের সফল আয়োজন করেন, যা রূপালী ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত হয়। পুরো টুর্নামেন্টে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নারী দলের ম্যানেজার নাজমুল আবেদিন ফাহিম। জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তিনি ভারতের বিহারে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে দলকে চ্যাম্পিয়ন করান।

একসময় লালমনিরহাটে ক্রিকেট কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ৩-৪ বছরেও ডিএসএর কোনো টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়নি (বর্তমানেও একই অবস্থা বিদ্যমান)। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় ১৯৯৭ সালে তিনি “ক্রিকেট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন” প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম বছরেই ১৬টি দল নিয়ে ২টি মাঠে ৩২ ম্যাচের সফল টুর্নামেন্ট আয়োজন করেন, যা “ওয়েলফেয়ার লীগ” নামে ৩ মৌসুম অনুষ্ঠিত হয়।

ক্রিকেটারদের নিয়মিত খেলার সুযোগ নিশ্চিত করতে এবং বছরে একাধিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য তিনি নিরন্তর সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন—জেলা ক্রীড়া সংস্থায় যদি নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক ও ক্রিকেটপ্রেমীরা দায়িত্ব পান, তাহলে প্রতি বছর প্রিমিয়ার, ১ম, ২য়, ৩য় বিভাগ ও একাডেমি কাপসহ একাধিক টুর্নামেন্ট আয়োজন সম্ভব।

পৌরসভা, প্রশাসন, চেম্বার অব কমার্স ও ব্যক্তি পর্যায়ের সহযোগিতা পেলে প্রতি বছর ৪-৫টি বড় টুর্নামেন্ট আয়োজন করা সম্ভব—যা তরুণদের অপসংস্কৃতি ও অপরাধ থেকে দূরে রেখে একটি সুস্থ ক্রীড়া পরিবেশ গড়ে তুলবে।

লালমনিরহাটের ক্রিকেটের এই নিরলস কর্মী এখনও স্বপ্ন দেখেন একটি প্রাণবন্ত, সংগঠিত ও সম্ভাবনাময় ক্রীড়াঙ্গনের।