সুন্দরবনকে রক্ষা করা এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করতে সরকার, রাজনৈতিক দল, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই বলে মত দিয়েছেন বক্তারা। পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), ব্রাইটার্স, পশুর রিভার ওয়াটারকিপার, সচেতন ফাউন্ডেশন এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ-এর যৌথ উদ্যোগে "People's Mandate: Manifesto to Action" সিরিজের অংশ হিসেবে শনিবার (২৫ জুলাই) বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত "টেকসই উন্নয়নের জন্য সুন্দরবন ও উপকূলীয় জীবিকার সুরক্ষা" শীর্ষক দিনব্যাপী নাগরিক সংলাপে বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন।
প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন শরীফ জামিল, সদস্য সচিব, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) এবং সমন্বয়কারী, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, এমপি, মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
প্রথম অধিবেশনের প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, এমপি বলেন, সুন্দরবন বাংলাদেশের পরিবেশগত নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই সুন্দরবন সংরক্ষণে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে এবং বন ও পরিবেশবিরোধী যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। তিনি বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হবে। সুন্দরবনের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল ৮ হাজার ২৭১ জন জেলের জন্য প্রথমবারের মতো ৬ হাজার ৬৬২ টন ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মাছ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নিষিদ্ধ মৌসুমে বনে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, উদ্ধার হওয়া বন্যপ্রাণীকে পুনরায় বনে অবমুক্ত করা এবং মানুষ-বন্যপ্রাণীর দ্বন্দ্ব কমাতে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় পরিবেশবান্ধব বেড়া নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার নতুন করে কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
দিত্বীয় অধিবেশনের প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনা সিটি কর্পোরেশন মাননীয় প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বাস্তুচ্যুতি বাড়ছে। তাই বননির্ভর মানুষের বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের নিজ এলাকায় টেকসইভাবে বসবাসের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বন অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ বন আদালত গঠন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে সুন্দরবন রক্ষা কমিটি গঠন এবং বন ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সুন্দরবনের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় পর্যটন ব্যবস্থাপনা, বনজ সম্পদ আহরণ এবং সংরক্ষিত এলাকার কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে খুলনা-১ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান বলেন, সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষার অন্যতম প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। তিনি বলেন, বন দস্যু ও অসাধু চক্র দমনে সরকারের পরিচালিত 'Restore Peace in Sundarban' ও 'Mangrove Shield' অভিযানে ইতিবাচক ফল এসেছে। একই সঙ্গে Nature-based Solution, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৃক্ষরোপণ এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুন্দরবন সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাগেরহাট-৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীম বলেন, সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয়। তিনি প্রজনন মৌসুমে জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে বন সংরক্ষণ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত বনায়ন কর্মসূচি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, সুন্দরবনকে রক্ষা করতে পারলেই উপকূল ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদ থাকবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাগেরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনের অংশ হিসেবে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার ছিলাম। সুন্দরবন আমাদের ফুঁসফুস। সুন্দরবন রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো কঠোর হতে হবে। সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প জীবিকায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে শরীফ জামিল বলেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দল জনগণের কল্যাণের লক্ষ্য নিয়েই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করে। সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী, স্থানীয় প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের মতামতকে নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, "People's Mandate: Manifesto to Action" উদ্যোগের উদ্দেশ্য সরকারের সমালোচনা নয়; বরং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তথ্যভিত্তিক সুপারিশ ও গঠনমূলক সহযোগিতা প্রদান।
তিনি আরও বলেন, অবৈধ শিকার, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, নিষিদ্ধ আহরণ, বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দূষণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন সুন্দরবনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এসব সংকট মোকাবিলায় কঠোর আইন প্রয়োগ, কার্যকর নজরদারি, বননির্ভর মানুষের বিকল্প জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং দায়িত্বশীল বন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া, সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চল সংরক্ষণে স্বতন্ত্র উপকূলীয় বোর্ড/কর্তৃপক্ষ গঠন এবং সুন্দরবন ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক অঙ্গীকারসমূহ পাঠ করেন রিভার বাংলার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন মনিরা শারমিন, আহ্বায়ক, জাতীয় নারীশক্তি ও যুগ্ম আহ্বায়ক (কেন্দ্রীয় কমিটি), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি); শারমিন আক্তার সুমী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মোংলা; মো. রেফাতুল ইসলাম, সহকারী পুলিশ সুপার, মোংলা সার্কেল; মো. রেজাউল করিম চৌধুরী, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও), বাগেরহাট; মো. আব্দুল মান্নান হাওলাদার, সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), মোংলা উপজেলা শাখাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, পরিবেশবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।
সংলাপে বক্তারা সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক অঙ্গীকারসমূহ দ্রুত বাস্তবায়ন, অংশগ্রহণমূলক নীতিনির্ধারণ এবং সরকার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব জোরদারের আহ্বান জানান।
রংপুরে প্রিপেইড মিটার বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ
৫৯ মিনিট আগে