রংপুরে ১০০ শয্যার আধুনিক শিশু হাসপাতালটি নির্মাণের ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। জনবল সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতায় থমকে আছে ৩১ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই হাসপাতালের কার্যক্রম। ফলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু রোগীর চাপ বেড়েই চলেছে। কেন শিশুদের জন্য বিশেষায়িত এই সেবাটি চালু করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মাঝে। বর্তমানে হাসপাতাল ভবনের নিচতলার তিনটি কক্ষে শিশু বহির্বিভাগ করা হয়েছে, শুধু টিকিট কেটে চিকিৎসক দেখানোর ব্যবস্থা। কিন্তু সেখানে কোনো রোগী ভর্তির সুযোগ নেই।
রংপুর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সিটি কর্পোরেশনের সামনে সদর হাসপাতালের ১ একর ৭৮ শতাংশ জমির ওপর উত্তরবঙ্গের প্রথম সরকারি ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। ব্যয় হয় ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ৯২ হাজার ৮০৯ টাকা। নির্ধারিত সময়ের আড়াই মাস আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজ শেষে শিশু হাসপাতাল ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা সিভিল সার্জনকে হস্তান্তর করা হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২০ সালের প্রথম দিকেই শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম শুরুর কথা ছিল। বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে দেখা দেওয়া কোভিড-১৯ থমকে দেয় সকল কার্যক্রম। করোনা রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করে স্বাস্থ্য বিভাগ। ১৯ এপ্রিল থেকে শিশু হাসপাতালটিতে করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু হয়। এতেই পিছিয়ে যায় শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম।
রংপুরের স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, তিন তলা মূল হাসপাতাল ভবনের প্রতি তলার আয়তন ২০ হাজার ৮৮২ দশমিক ৯৭ বর্গফুট। এছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে চার তলা ভিত্তির তিন তলা সুপারিনটেনডেন্ট কোয়ার্টার। সিঁড়ি বাদে প্রতি তলার আয়তন দেড় হাজার বর্গফুট। ছয় তলা ডক্টরস কোয়ার্টারের নিচতলায় গাড়ি পার্কিং, দ্বিতীয় তলা থেকে ডাবল ইউনিট। আছে ছয় তলা বিশিষ্ট স্টাফ অ্যান্ড নার্স কোয়ার্টার। দুই তলা বিশিষ্ট গ্যারেজ কাম ড্রাইভার কোয়ার্টার। নিচে দুটি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। বিদ্যুৎ সাবস্টেশন স্থাপনের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে একটি ভবন। শিশু হাসপাতালের মূল ভবনের ১ম তলায় থাকবে ইমার্জেন্সি, আউটডোর, চিকিৎসকদের চেম্বার এবং ল্যাব। দ্বিতীয় তলায় অপারেশন থিয়েটার, ব্রোন ইউনিট এবং ৩য় তলায় ওয়ার্ড ও কেবিন থাকবে। তিন তলা এই ভবনে জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, ওয়ার্ড, কেবিন এবং চিকিৎসকদের আবাসনসহ সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের অধিকাংশ কক্ষই অব্যবহৃত পড়ে আছে।
শিশু হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় পুরো বিভাগের শিশুদের চিকিৎসার ভার পড়ছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ১০৮টি শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩ শ শিশু রোগী ভর্তি থাকছে। শয্যা সংকটে অনেক শিশুকে হাসপাতালের বারান্দায় বা মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
রংপুর মেডিকেলে আসা এক রোগীর অভিভাবক আক্ষেপ করে বলেন, শহরে এত বড় একটি হাসপাতাল পড়ে আছে, অথচ আমাদের মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
রংপুর সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ৮ মার্চ সিভিল সার্জনকে হাসপাতাল ভবন বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক অনুমোদন, জনবলের পদ সৃষ্টিসহ প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ছাড়াই তৎকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রী হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৫ জুন ৬৫৯ জনবল নিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। তৎকালীন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক আবু হানিফ এই চিঠি দেন। হাসপাতালের পেছনে বছরে ৪৬ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৬৩৮ টাকা ব্যয় হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি শিশু হাসপাতালে অস্থায়ীভাবে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্ধিত শিশু বহির্বিভাগ চালুর নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। পরে ১৫ ফেব্রুয়ারি হাসপাতাল ভবনের নিচতলার তিনটি কক্ষে শিশু বহির্বিভাগ করা হয়। শুধু টিকিট কেটে চিকিৎসক দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে রোগী ভর্তির কোনো সুযোগ নেই।
রংপুর জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্র জানায়, শিশু হাসপাতালটিতে একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা ও চারজন কনসালট্যান্ট প্রেষণে সংযুক্ত আছেন। প্রতিদিন চিকিৎসা কর্মকর্তা ও একজন কনসালট্যান্ট সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত রোগী দেখেন।
শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগের চিকিৎসক আমাতুল্লা নাসিরা জানান, হাসপাতালের বহির্বিভাগে এখন ৪০ থেকে ৫০ জন শিশু চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হলে শিশুরা উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে। প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে সেটা এখন সম্ভব হচ্ছে না।
নগরীর দর্জিপাড়া এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী পারুল বলেন, সাধারণত বছরের প্রায় সময় শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত অভিভাবকদের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সেখানেও প্রায় সময় রোগীর চাপ থাকে। ফলে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল চালু হলে স্বল্প খরচে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হতো।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, হাসপাতালটি চালু করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে কয়েকবার চিঠি দেন জেলা সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য)। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ হাসপাতালটি চালু করতে পরিদর্শন প্রতিবেদন চায়। একাধিকবার সুপারিশসহ প্রতিবেদন পাঠানো হয়।
রংপুরের সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর রংপুর জেলার সভাপতি অধ্যক্ষ ফখল আনাম বেঞ্জু বলেন, শিশুদের জন্য আলাদা বিশেষায়িত হাসপাতাল হলে এ অঞ্চলের মানুষ অনেক উপকৃত হবেন। বেসরকারি হাসপাতালে অনেকের চিকিৎসা ব্যয় বহনের সামর্থ্য থাকে না। দীর্ঘদিনেও কেন এই হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হলো না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হোক।
রংপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা জানান, গত বছরের ৫ অক্টোবর ১০০ শয্যার সেবা কার্যক্রম চালুকরণে অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। হাসপাতাল চালু না হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ জেলা উন্নয়ন কমিটির সভায় একাধিকবার আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে।