রংপুরের শহীদ আবু সাঈদের পরিবার তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই মামলার রায় ঘোষণায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের আদেশের রায়ে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় শহীদ আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যরা পলাতক শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য আসামিদের ভারত থেকে বাংলার মাটিতে নিয়ে এসে রায় কার্যকর করতে হবে। দ্রুত দেশে এনে রায় কার্যকর করার দাবি জানান পরিবারের সদস্যরা।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) দুপুরে বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পাশাপাশি এই মামলার অন্য আসামি হলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিন আসামির মধ্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক রয়েছেন।
শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, আমি রায়ে খুশি খুব দ্রুত বিচার দেখতে চাই। আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে আমার ছেলেকে পুলিশ সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছে। আমি হুকুমদাতাসহ পুলিশের বিচার চাই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই। শুধু তাই নয়, রায়ের পর আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা সারাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে শহীদ ও আহতসহ জুলাই যোদ্ধাদের সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ নিতে হবে। ফ্যাসিবাদের দোসরদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া বা পুনর্বাসন করা যাবে না। হত্যা করার অনুমতি দিয়েছিল বলেই আমার ছেলের মতো হাজার হাজার মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। অনেকে হাত–পা হারিয়েছে, পঙ্গু হয়েছেন। অনেকের চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। হাসপাতালে এখনো অনেকে কাতরাচ্ছে।
শহীদ আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, আমরা সবার বিচার চাই। যারা হুকুম দিয়েছে যারা গুলি করেছে সবাইকে ফাঁসি দিতে হবে। আমি মা হয়ে এখন বুঝতে পারছি সন্তান হারানোর কষ্ট কত। আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে আমার মতো অনেক মা, বোন, ভাই সন্তান হারিয়েছে, স্বামী হারিয়েছে। অনেক জীবন–সংসার শেষ হয়ে গেছে। সব ঘটনার বিচার হতে হবে।
শহীদ আবু সাঈদের বড়ভাই আবু হোসেন বলেন, শুধু রায় ঘোষণা করলে হবে না বিচার কার্যকর করতে হবে। শেখ হাসিনা ও তার দোসররা দীর্ঘদিন স্বৈরাচারী সিস্টেমে গুম–খুন করেছে। জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র–জনতাকে নির্মমভাবে গণহত্যা করে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে। আজ সোমবার প্রথম রায় হয়েছে। শুধু রায়েই সীমাবদ্ধ নয়, এটি কার্যকর করতে এই দেশের মাটিতে এনে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। তাহলে শহীদদের আত্মারা শান্তি পাবে।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার বাদী বড়ভাই রমজান আলী বলেন, আবু সাঈদকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো বিশ্ব দেখেছেন। পুলিশ তাকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছে। সেই ভিডিও ফুটেজ সবাই দেখেছে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচার শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রীপরিষদের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারছেন ভাই হারানো, বোন হারানো, মা হারানো, স্বামী হারানোর যন্ত্রণার দাহ। আমরা এমন বিচার দেখতে চাই খুনিরা যে দেশেই পালিয়ে থাকুক তাদের ধরে এনে শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আবু সাঈদের বাবনপুর গ্রামের স্থানীয়রা জানান, শেখ হাসিনাসহ এসব হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের সবার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায়ে আমরা খুশি, তা যদি কার্যকর না হয় তাহলে সবকিছুই বৃথা হয়ে যাবে।
কোটা বিরোধী আন্দোলন চলাকালে গত ২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পার্ক মোড়ে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। এসময় পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নিহত হন। পরদিন ১৭ জুলাই পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়। শহীদ আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে গুলি করার দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও দেশি–বিদেশি গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ হলে সারাদেশে আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। আবু সাঈদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ১২ ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন।