রাজনীতিকরণ,আত্মীয়করণ ও অবৈধ অর্থ লেনদেন, জালিয়তি ,প্রতারণা ও অসত্য তথ্য দিয়ে দেশে হাজার হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরীর করে সরকারি ভাতা প্রদান করা হয়েছে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) এখন পর্যন্ত প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি ভাতা নেয়া ৮ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনাক্ত করেছে ।ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনাক্তকরণ অব্যাহত রয়েছে। এই জালিয়াত, প্রতারক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে প্রদেয় ভাতা সুদে আসলে ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা নিবে সরকার বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ।
২০২০ সালে অক্টোবর মাসে মুক্তিযোদ্ধাদের কথিত তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের করে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এম আই এস) নামে একটি সফটওয়্যার যুক্ত করা হয় ।শুরুতেই এই এমআইএস মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল এক লাখ কয়েক হাজার। বর্তমানে নানারূপ জালিয়াতি, রাজনীতি করন আত্মীয়করণ এবং ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ কয়েক ঝহাজার ।উল্লেখ্য ইতোমধ্যে যে সকল ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা নিজের সরকারি চাকরি ,ছেলে মেয়েদের সরকারি চাকরি ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা নিয়ে সমৃদ্ধ হয়েছেন।এরূপ ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা লক্ষাধিক।
দেশের কোন সরকার এখন পর্যন্ত চিহ্নিত ও প্রমাণিত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি ফলে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরীর প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছিল।বিজয়ের ৫০/৫২ বছর পরেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রস্তুত, রাষ্ট্রীয় ভাতা প্রদান অন্যান্য সুযোগ প্রদান পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ও জঘন্যতম অপরাধ । ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরি ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান স্বাধীনতার চেতনার,আদর্শের ও লক্ষ্যের পরিপন্থী। শুধু তাই নয় স্বাধীনতায় রক্তদানকারী, ,সম্ভ্রম দানকারী মা-বোনদের এবং নির্যাতন নিপীড়ন ভোগকারী নর-নারীদের ,সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্তপূর্ণ ত্যাগের প্রতি চরম অবমাননা।
২০১৪ সালে খোদ মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ,দুইজন যুগ্ম সচিব ,বেসরকারি কমিশনের চেয়ারম্যান ,পিএসসির সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সহ ১৬ জন
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভুয়া সনদ বাতিল হয়। বিগত ১১ বছরে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে জেল-জরিমানা প্রদান করা হয়নি। বরং এই সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে সরকারি যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অবসরে চলে গেছেন। অথচ ফৌজদারি আইনের ৪১৬ ধারায় মুক্তিযোদ্ধা না হয়ে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেওয়া অপরাধ, মিথ্যা পরিচয়ের জন্য তিন বছর জেল, জরিমানার বিধান রয়েছে। ভুয়া তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা নিলে জেল হবে ৭ বছর ।অথচ এদের বিরুদ্ধে কিছু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি ।ফলে দেশে লক্ষাধিক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরী হয়েছে।মুক্তিযুদ্ধকালীন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাগণ ক্রমেই কোণঠাস হয়ে পড়ছে। সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের ৪০ থেকে ৫০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধস ইন্তেকাল করেছেন। ২০ থেকে ২৫ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা শয্যাশায়ী, বাকি মুক্তিযোদ্ধারা চলাফেরা করছেন।অথচ মুক্তিযুদ্ধের ৩০-৪০, ৫০, ৫২ বছর পর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধার মনোগ্রাম লাগিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
এই সকল ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের পেছনে ছিল রাজনৈতিক দলীয় অপশক্তি ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। তাই সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা এই রাজনৈতিক দলীয় শক্তিকে মোকাবেলা করতে পারে নাই। তাই এই সকল ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও জঘন্য অপরাধিদের সহ্য করতে হয়েছিল
দেশে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করতে প্রতিটি জেলায় বিচার বিভাগীয় বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করা করা সময়ের দাবি। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ট্যাক্সসের হাজার হাজার কোটি টাকা অন্যায় ভাবে গ্রহণ করতে পারে না। অবশ্যইএই জঘন্য অপরাধীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে কি । সর্বোপরিঅপরাধীদের চিহ্নিত করতে বিচার বিভাগীয় ট্রাইব্যুনাল গঠনের কোন বিকল্প নেই।
ইতোমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সংসদদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল এর আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আহবায়ক কমিটি প্রতিটি জেলা ও মহানগরে আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। এ সকল কমিটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আহবায়ক কমিটি গঠন করবে। উপজেলা ইউডিয়ান আহবায়ক কমিটির অন্তর্ভুক্ত করবে। প্রত্যেকটি সদস্যকে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক। উক্ত অঙ্গীকারনামায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আমি প্রশিক্ষণ নিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। আমি বিগত দিনে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরিতে করি নাই,এমন কি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরিতে কোনরূপ সহযোগিতা করি নাই। অর্থাৎ আমার দ্বারা কোন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরি হয়নি। তৃতীয় তো আমি কোন রাজনৈতিক দল কিংবা অঙ্গ সংগঠনের পদধারী ব্যক্তি নহি।কেউ রাজনৈতিক দলের বা অঙ্গসংগঠনের পদধারী ব্যক্তি হলে, তাদেরকে দল কিংবা অঙ্গসংগঠন থেকে পদত্যাগ করতে হবে।পদত্ত্যাগ না করলে, অর্থাৎ অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর না করলে কোন অবস্থায় সংসদের কোন পদে থাকতে পারবে না ।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদে একটি অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। গঠনতন্ত্রে তা উল্লেখ রয়েছে। বিগত ৫৪ বছরে রাজনীতি করণ এর মাধ্যমে অর্থাৎ দলীয়করণের মাধ্যমে লক্ষাধিক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। বর্তমান সংসদ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে জামুকাকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করবে। অপরদিকে রণাঙ্গনের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তুত করে, জাতির সামনে তুলে ধরবে। যাতে করে দেশবাসী ও আগামী প্রজন্ম রণাঙ্গনের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারে।