ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত নেতা গরীব দুঃখী মজলুম জনগণের অধিকার আদায়ের প্রাণপুরুষ নিবেদিত দেশপ্রেমিক বৃটিশ বিরোধী সলঙ্গা বিদ্রোহের মহানায়ক ৫২’র ভাষা আন্দোলনের অগ্নি পুরুষ মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি ও স্বজন-গুণগ্রাহীদের গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।
ন্যায় ও সত্যের পক্ষে আজীবন সংগ্রামী মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ ১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর পাবনা জেলার তৎকালীন সিরাজগঞ্জের মহকুমার উল্লাপাড়া থানাধীন (বর্তমান সলঙ্গা থানার) তারুটিয়া গ্রামে এক পীর বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শাহ সৈয়দ আবু ইসহাক ও মাতা আজিজুন্নেসা।
তাঁর পূর্বপুরুষ বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানীর বংশধর শাহ সৈয়দ দরবেশ মাহমুদ ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাগদাদ থেকে বাংলাদেশে আসেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটে৷ মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে অসহায় দুধ বিক্রেতাদের সংগঠিত করে দুধের ন্যায্যমূল্য প্রদানে মহাজনদের বাধ্য করেন।
১৯১৯ সালে তিনি খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন৷
১৯২২ সালে ২২ বছর বয়সে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী ঐতিহাসিক 'সলংগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেন, যার জন্য তাঁকে কারাভোগ করতে হয়৷ এই 'সলংগা আন্দোলন' ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে "রক্তসিঁড়ি" হিসেবে পরিচিত৷
রক্তাক্ত সলংগা তদানিন্তন পাবনা জেলার সলংগা একটি বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়িক জনপদ। সপ্তাহে ২ দিন হাট বসতো। ১৯২২ সালে ২৭ জানুয়ারি শুক্রবার ছিল বড় হাটবার। মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের কর্মীরা হাটে নেমেছে বিলেতি পণ্য ক্রয় বিক্রয় বন্ধ করতে। আর এই স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের রুখতে ছুটে আসে তদানিন্তন পাবনা জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট জনাব আর. এন. দাস, জেলা পুলিশ সুপার ও সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রসাশক জনাব এস. কে. সিংহসহ ৪০ জন সশস্ত্র লাল পাগড়ীওয়ালা পুলিশের একটি দল। সলংগার গো-হাটায় ছিল বিপ্লবী স্বদেশী কর্মীদের অফিস। পুলিশ এসে তার ব্যাটিলিয়নদের নিয়ে গ্রেফতার করে নেতৃত্বদানকারী মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে। সঙ্গে সঙ্গে জনতার মধ্যে থেকে ম্যাজিষ্ট্রেট, পুলিশ সুপার ও মহুকুমা অফিসারকে ঘিরে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে উদ্ধারের জন্য মিছিল বের করে। জনতার ঢল ও আক্রোশ দেখে ম্যাজিষ্ট্রেট জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে গুলি চালাতে নির্দেশ দেয়। শুরু হয় বুলেট-বৃষ্টি। এই পৈশাচিক হত্যাকান্ডে হতাহতের সরকারি সংখ্যা ৪৫০০ দেখানো হলেও বেসরকারি মতে ১০০০০ এরও অধিক হবে বলে জানা যায়। সলংগা হাটের হত্যাকান্ডের ঘটনা জালিয়ান ওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের চেয়ে বহুগুণ ভয়ংকর নৃশংস। অথচ ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের তথা শতাব্দির গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনা অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে চাপা পড়ে আছে। বস্ততপক্ষে ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯২২ সালের বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে সলংগা হত্যাকান্ডের ঘটনা যেমন সবচেয়ে নৃশংস পাশবিক তেমনি নিহতের সংখ্যা সর্বাধিক। নিহতদের লাশের সাথে সংজ্ঞাহীন আহতদের উঠিয়ে নিয়ে ব্রিটিশ পুলিশ সিরাজগঞ্জের রহমতগঞ্জে গণকবর দেয়।
বর্তমানে, ২৭ জানুয়ারি সেসব শহীদদের স্মরণ করে "সলংগা দিবস" পালিত হয়।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ায় তাঁর পক্ষে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে শিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি যুক্ত প্রদেশের বেরেলি ইশতুল উলুম মাদ্রাসা, সাহারানপুর মাদ্রাসা, দেওবন্দ মাদ্রাসা ও লাহোরের এশাতুল ইসলাম কলেজে অধ্যয়ন করেন ও তর্কশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করে তর্কবাগীশ উপাধিতে ভূষিত হন৷ মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ১৯৩৩ সালে রাজশাহীর চাঁটকৈড়ে নিখিলবঙ্গ রায়ত খাতক সম্মেলন আহ্বান করে ঋণ সালিশী বোর্ড আইন প্রণয়নের প্রস্তাব রাখেন ৷ তিনি ১৯৩৭ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে নাটোরে কৃষক সম্মেলন আহ্বান করেন ৷ তিনি গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন ৷ ১৯৩৮ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে তিনি বাংলা, আসাম ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন৷
মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সভাপতিত্বে গঠিত ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন৷ পরবর্তীকালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগে যোগ দেন ৷ মাওলানা তর্কবাগীশ পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন
১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন৷ তিনি অবিভক্ত বাংলার এম.এল.এ হিসেবে তৎকালীন ব্যবস্থাপক পরিষদে পতিতাবৃত্তি নিরোধ, বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ও বিনা ক্ষতি পূরণে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার দাবীরত ছাত্রদের উপর পুলিশের গুলি বর্ষন করে হতাহত করার প্রতিবাদে মাওলানা তর্কবাগীশ আইন পরিষদে সর্ব প্রথম তুমুল প্রতিবাদের ঝড় তোলেন৷ মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ে সংগ্রামরত ছাত্র জনতার উপর পুলিশী নির্যাতনের সংবাদ পেয়ে প্রাদেশিক পরিষদ থেকে বেরিয়ে এসে মহান ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেন৷ তিনি ১৯৫২ সালে ২২শে ফেব্রুয়ারি মুসলীম লীগ ত্যাগ করে প্রাদেশিক পরিষদে বিরোধী দল গঠন করেন এবং নুরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনেন। ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
১৯৫৫ সালের ১২ আগষ্ট পাকিস্তানের গণ পরিষদে রাষ্টীয় ভাষা বাংলার দাবীতে তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় বক্তব্য দেন।
১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
মাওলানা তর্কবাগীশ খেলাফত আন্দোলন,কৃষক আন্দোলন, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলন, ৫৪'র যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ৬৯'র গণ অভ্যুথ্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসাবে অনন্য অবদান সহ দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে সকল মুক্তির আন্দোলনে পুরো সামনে থেকে জাতির অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থেকেছেন আজীবন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি নির্মাণে যে সব মনীষী কালজয়ী অবদান রেখেছেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম৷ তিনি একজন সুসাহিত্যিকও ছিলেন ৷ তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে : শেষ প্রেরিত নবী, সত্যার্থে ভ্রমণে, ইসলামের স্বর্ণযুগের ছিন্ন পৃষ্ঠা, সমকালীন জীবনবোধ, স্মৃতির সৈকতে আমি, ইসমাইল হোসেন সিরাজী ইত্যাদি ৷
স্বাধীনতা অর্জনের পরই মাওলানা তর্কবাগীশের প্রচেষ্টায় মাদ্রাসা শিক্ষা পুনরায় চালু করে মাদ্রাসা শিক্ষা বোডর্র চেয়ারম্যান হিসাবে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকিকরণ ও একে বিজ্ঞান সম্মত রুপদান করেন। তিনিই প্রথম রেডিও ও টেলিভিশনে কোরআন তেলোয়াতের নিয়ম চালু করেন।
তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আশির দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন।
মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ স্মরণে প্রতিবছর বিভিন্ন অণুষ্ঠান পালন করা হয়।
স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ মরহুম মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে "স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ২০০০" (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়৷ এছাড়া তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর নামে কিছু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
নুরুন্নাহার তর্কবাগীশ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, রায়গঞ্জ
চড়িয়া মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ বিজ্ঞান মাদ্রাসা, উল্লাপাড়া
পাটধারী মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ উচ্চ বিদ্যালয়, সলংগা, উল্লাপাড়া
মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ পাঠাগার
মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ফাউন্ডেশন
এই মহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের স্মৃতি বিজরিত সলঙ্গা থানা কে উপজেলা ও পৌরসভার মর্যাদা দিয়ে তাঁর স্মৃতি কে অম্লান করে রাখার জন্য এ থানায় বসবাসরত প্রায় চার লক্ষাধিক মানুষের বর্তমান সরকারের নিকট একান্ত প্রত্যাশা।
জাতীয় ইতিহাসের এই বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও মহান এই জাতিয় নেতা ১৯৮৬ সালের ২০শে আগস্ট দেশবাসীকে কাঁদিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমান।
হে মহান স্রষ্টা হে দয়াময় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মাওলানা মরহুম আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ কে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন, আমিন।