রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ সারাদেশ

হিন্দু পল্লীতে ফের হামলার আশংঙ্কায় জিনিষপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন বাসিন্দারা


প্রকাশ :

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় মহানবীকে নিয়ে কটুক্তির ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিন্দু পল্লীতে সহিংসতায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে ফের হামলার আশংঙ্কা এবং ভয় ও আতংঙ্কে বাড়ির জিনিষ পত্র অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন অনেক বাসিন্দা। কেউ কেউ এখনও বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গ্রামে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন থাকলেও ভরসা পাচ্ছেননা গ্রামবাসী। সোমবার সকালে দেখা গেছে, হামলার শিকার পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি লন্ডভন্ড। আতঙ্কে পরিবারগুলো গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি ও অন্য মালামাল ভ্যানে করে সরিয়ে নিচ্ছেন। অনেকে গরু, ছাগল ও ধান বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। আলদাদপুর নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ও ভেতরে অবস্থান করছে সেনাবাহিনী। কাছাকাছি খিলালগঞ্জ বাজারে পুলিশ ও সেনা সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। গঙ্গাচড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল এমরান বলে জানিয়েছেন, হিন্দু পল্লীতে হামলার ঘটনায় সোমবার (২৮ জুলাই) পর্যন্ত কেউ মামলা করেনি। 

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী ইউনিয়নের আলদাতপুর ছয়আনি গ্রামের সুজন চন্দ্রের ছেলে রঞ্জন রায় ফেসবুকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ব্যঙ্গচিত্র তৈরী এবং অশালীন মন্তব্য লিখে ফেসবুকে একাধিকবার পোস্ট করে। বিষয়টি ফেসবুকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে আশেপাশের এলাকায় চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ গত (২৬ জুলাই) সন্ধ্যায় নিজবাসা থেকে রঞ্জনকে গ্রেফতার করে। মহানবীকে কটুক্তির প্রতিবাদে ২৭ জুলাই বিকেল ৩টার দিকে নীলফামারী কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের সিঙ্গের গাড়ি এলাকার বিক্ষুব্ধ বাসিন্দারা লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে সিঙ্গেও গাড়ি বাজাওে এসে জমায়েত হয়। এরপর তারা রঞ্জন রায়ের ফাঁসি দাবীতে মিছিল নিয়ে খিলাল গঞ্জ বাজার হয়ে ছয়আনি হিন্দু পল্লীতে আসে এবং প্রায় ১২টি ঘরবাড়িতে ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে সোমবার পূনরায় হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের আতংঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ছয়আনী গ্রামবাসীর মাঝে। আতংঙ্কে তারা সকাল থেকে আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় বাড়ির মালামাল, গরু-ছাগল সরিয়ে ফেলে।

 রবীন্দ্রনাথ রায় নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, তাঁর স্ত্রীর এক ভরি স্বর্ণ কাপড়-চোপড় ও জমির কাগজপত্র লুট হয়েছে।যদি আবার আগুন দেয়, তবে আর কিছু থাকবে না। কাঁথা-বালিশ, তোশক সব তাঁর ভাই নিয়ে গেছে।  

আলদাদপুর নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আলদাদপুর দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের আশপাশেই এসব হামলার ঘটনা ঘটে। দুটি বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী দেখা যায়নি।

আলদাদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কালী রঞ্জন রায় বলেন, বিদ্যালয়ের ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী সনাতন ধর্মাবলম্বী। গতকাল রোববার ছুটি দেওয়া হয়েছে আজ কেউ আসেনি। অনেকে পরিবারসহ বাইরে অবস্থান করছে।

ছয়আনী গ্রামের বাসিন্দা শংকর রায় বলেন, শুনতে পারলাম আজকেও তারা নাকি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট চালাবে। এজন্যই গরু-ছাগল গুলো নিয়ে আমার এক দিদিও বাসায় রাখতে যাচ্ছি। গতকাল থেকে আজকে আরো বেশি ভয় লাগতেছে। পুলিশের সামনে গতকাল আমাদের ঘরবাড়ি গুলো ভাঙচুর এবং লুটপাট করা হয়। আজকে যদি আবার আগুন দেয় তাহলে তো কিছুই থাকবেনা। এজন্য আগে ভাগে সব কিছু সরিয়ে নিচ্ছে সবাই। 

অপর বাসিন্দা নারায়ন মহন্ত বলেন, যে অপরাধ করেছে তাকে শাস্তি দেয়া হোক, কিন্তু একজনের অপরাধের দায়ভার কেন পুরো গ্রামবাসীর উপর দেয়া হলো। আমি রাজমিস্ত্রির কাজ করে খাই, অনেক কষ্টে বাড়িটি সাজিয়েছি। আমার তো কোন দোষ নাই, তাহলে কেন আমার বাড়িতে হামলা হলো। আমি এ হামলার বিচার চাই। ভয়ে আমাদের এলাকার প্রায় ১’শ পরিবার বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। 

স্থানীয় ইউপি সদস্য পরেশ চন্দ্র রায় বলেন, আজ সোমবার দুপুরের পর আবার মিছিল নিয়ে আসার হুমকি এসেছে। আতঙ্কে অনেকে স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।

গঙ্গাচড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল এমরান বলেন, হিন্দু পল্লীতে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোন মামলা হয়নি। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সেখানে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। ভয়ে-আতংঙ্কে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। 

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, ছয়আনী গ্রামে যেন কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে লক্ষ্যে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের পক্ষে থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ক্ষতি গ্রস্থ পরিবারের জন্য শুকনা খাবার ও টিনের ব্যবস্থা করেছি।