উজানের ঢল ও টানা ভারী বর্ষণে গত দুইদিনে তিস্তা নদীর পানি বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে লালমনিরহাট জেলার তিস্তা তীরবর্তী বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের শত শত একর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিতে ডুবে গেছে বাদাম, ভুট্টা, পাট ও ধানের মাঠ। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। চরাঞ্চলের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে জমে আছে হাঁটু পানি। তলিয়ে গেছে চরের রাস্তা ঘাট।
সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্ট পানি বিপদসীমার ৪৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানাগেছে, রোববার সকাল ৬টার তিস্তার পানি বিপদসীমার মাত্র ২১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি প্রবাহ কমতে থাকে। একই পয়েন্টে বিকাল ৩টায় তিস্তার পানি বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরদিন সোমবার সকাল ৬টায় বিপদসীমার ৬১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এরপর সকাল ৯টায় ৬৫ সেন্টিমিটার, দুপুর ১২টায় ৭০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু ৩ ঘন্টার ব্যবধানে তিস্তার পানি ফের বেড়ে বিকাল ৩টায় ৫৫ সেন্টিমিটার এবং সন্ধ্যা ৬টায় পানি আরো বেড়ে ৪৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যহত রয়েছে। তিস্তায় পানি বৃদ্ধি পাওয়া বন্যা আতংকে রয়েছেন দুই পাড়ের মানুষ।
এদিকে পানি বেড়ে যাওয়ায় অনেক জমির ফসল কাটার উপযুক্ত সময় হলেও তা ঘরে তোলার আগেই প্লাবিত হয়ে যায়। এতে সবজি ও অন্যান্য ফসল ঘরে তোলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন কৃষকেরা। তারা এখন নৌকা ও অন্যান্য উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত জমি থেকে ফসল উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় একই অবস্থা দেখা গেছে। নদী তীরবর্তী পাঁচটি উপজেলার চরাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। কোথাও কোথাও পাট, ভুট্টা, ও বাদাম পানিতে তলিয়ে গিয়ে গাছ পঁচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক পরিবারগুলো। বীজ, সার ও জমি চাষে নেওয়া ঋণ মেটানো তো দূরের কথা, অনেকে তাদের শেষ সম্বল ফসলটুকুও রক্ষা করতে পারছেন না। এখনই সরকারিভাবে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করা না হলে ওই এলাকার কৃষকদের পুনরুদ্ধার দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার হয়ে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মহিষখোচার গোবর্ধন এলাকার কৃষক আবুল হোসেন জানান, আমার দুই একর জমিতে ভুট্টা ছিল। কাটার সময় হয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ পানি এসে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল। এখন আর কিছুই করার নাই। নৌকা দিয়ে যা পারি তুলে নিচ্ছি।
আরেক কৃষক হাসান আলী বলেন, আর ১৫/২০ দিন সময় পেলেই বেশিরভাগ ফসল ঘরে তুলতে পারতাম। হঠাৎ করে বন্যায় ক্ষতির আশঙ্কা করছি। শেষ সময়ে এসে পানি পাইলে ফসল নস্ট হয়ে যাবে।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন বলেন, “ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। এ বছর বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় এ বন্যা দেখা দিয়েছে। আমরা পরবর্তীতে ক্ষতি নিরুপণ করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও ব্যাবস্থা গ্রহণ করবো।
পানি বোর্ড লালমনিরহাট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, শুষ্ক মৌসুমে যেসব এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছিল, সেখানে প্রতিরক্ষা কাজ আগেই সম্পন্ন করা হয়েছে। জরুরি দুর্ঘটনা মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত রয়েছি। আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী তিনদিন তিস্তায় পানি কিছুটা বাড়ন্ত থাকতে পারে। তবে তিস্তা পানি উন্নয়ন বোর্ডও রয়েছে সতর্ক অবস্থানে।