স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা, সমন্বয়হীনতা ও নাগরিক সচেতনতার অভাবে রংপুরের ফুসফুস খ্যাত শ্যামাসুন্দরী খালটি এখন মৃত্যর দাড়প্রান্তে। দখল আর দূষণের সঙ্গে সঙ্গে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে এখন পরিণত হয়েছে শতবর্ষী খালটি। বিভিন্ন সময় শ্যামাসুন্দরী সংস্কারে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলেও কোনো কাজে আসেনি। যদিও নতুন করে আরও ১৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে রংপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ড।
রংপুরের নদী গবেষক ও সংগঠকরা বলছেন, সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো প্রকল্পই কাজে আসবে না। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে শ্যামাসুন্দরীকে বাঁচাতে আগে খালটি পুনরুদ্ধার করে বিজ্ঞান সম্মতভাবে খনন ও সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নয়তো ভবিষ্যতে খালটির অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার সঙ্গে তীব্র জলাবদ্ধতায় ভোগান্তিতে পড়বে নগরবাসী।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খালে পানির প্রবাহ না থাকায় দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে নগর জুড়ে। এ ছাড়া অনেকে পয়ঃনিষ্কাশনের সংযোগ এ খালে দেওয়ায় পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন থেকে সংস্কার না করায় শ্যামাসুন্দরী খালটি নাব্যতা হারিয়েছে। এর দুই পাশ অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে খালটি। বর্তমানে শ্যামাসুন্দরীর কোলঘেঁষে এত অসহ্য দুর্গন্ধ যে এর পাশে মানুষ বাস করতে পারছে না।
নগরীর হাজীপাড়া ইঞ্জিনিয়ার পাড়ার রিপন বলেন, ২০১৯ সালে শ্যামাসুন্দরী খালের উন্নয়নের জন্য আমরা বাড়ি ভেঙে জায়গা ছেড়েছি। খালের পাড় থেকে গাছপালা কেটে ফেলেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও খালের কোনো উন্নয়ন হয়নি।
কামাল কাছনা এলাকার বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, আগে বৃষ্টি হলে শহরের সব পানি শ্যামাসুন্দরী খালে গিয়ে পড়ত। বতর্মানে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন অনেকটা বাধার সম্মুখীন। এ কারণে নগরীতে ভারী বৃষ্টিপাত হলে সৃষ্টি হয় ময়লা পানির ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।
রংপুর পৌরসভা থেকে সিটি করর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার প্রায় দেড় দশক সময় পেরিয়ে গেলেও শ্যামাসুন্দরী খাল এখন জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। মশা-মাছি আর পোকা-মাকড়ের প্রজনন ক্ষেত্রই শুধু নয়, দখল-দূষণেও এই খাল পরিবেশের জন্য এখন মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে সিটি করর্পোরেশন হওয়ার আগে দুটি প্রকল্পসহ বিভিন্ন ভাবে ১২৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয় শ্যামাসুন্দরীর সংস্কারে। অথচ এর সুফল পাননি নগরবাসী। সাবেক মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার সময়ে বলা হয়েছিল নতুন করে আরও ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রণয়ণের কাজ চলমান রয়েছে,সেটি বাস্তবায়ন হলে প্রাণ ফিরবে শ্যামাসুন্দরীর।
রংপুর সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, খালটি জেলা প্রশাসনের আমরা শুধু পরিস্কার করে থাকি। কিন্তু এরজন্য বরাদ্দ খুব একটা থাকে না।পরপর দুইবার পানিতে ডুবে ছিলাম। ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ১১ ঘণ্টায় ৪৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে নগরীর প্রধান সড়ক, পাড়া-মহল্লার অলিগলিসহ বেশিরভাগ এলাকা তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, মালামাল, খাদ্যশস্যসহ প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। স্থানীয়রা ঘরবাড়ি ছেড়ে গবাদি পশুসহ আশ্রয় নেয় নগরীর স্কুল গুলোতে।২০২১ সালের ৩ অক্টোবর ২৪ ঘণ্টায় ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে আবারো ডুবে যায় শ্যামাসুন্দরী নির্ভর নগরী।
এদিকে নতুন করে খালটির সংস্কারে ১৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড। যেখানে শ্যামাসুন্দরী সংস্কারের পাশাপাশি দুপাশে গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর মহানগর সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, পরিকল্পনা মাফিক কোনো উন্নয়নকাজ না হওয়ায় শ্যামাসুন্দরী খালটি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এক সময়ের ৬০ ফুট চওড়া খালটি বর্তমানে ১০ থেকে ১৫ ফুটে এসে ঠেকেছে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী মাহবুবর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে শ্যামা সুন্দরী পরিষ্কারের পাশাপাশি দুপাশে গাছ লাগানো হবে। এরপর স্টাডি করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে শ্যামা সুন্দরীর স্থায়ী সমাধানে কাজ করা হবে।