তিস্তা কর্তৃপক্ষ গঠন করে নিজস্ব অর্থায়নে দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ ছয়দফা দাবিতে ২ অক্টোবর ২০২৪ তিস্তা পাড়ের ১২ উপজেলায় মানববন্ধন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালিত হয়েছে।তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ এই কর্মসূচির আয়োজন করে। দুপুর ১২ থেকে ঘন্টাব্যাপী চলে মানববন্ধন কর্মসূচি। মানববন্ধন শেষে নেতৃবৃন্দ ১২ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার হাতে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় উপস্থিত ছিলেন তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী,স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য মশিয়ার রহমান,কেন্দ্রীয় নেতা মোশাররফ মুনশি, লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার কর্মসূচিতে ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান,কেন্দ্রীয় নেতা ওসমান গনি বাদশা ও মশিউর রহমান, ডিমলা উপজেলায় ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম মোস্তফা, হাফিজার রহমান,জলঢাকা উপজেলায় ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম পাশা এলিচ,জাহাঙ্গীর আলম,গংগাচড়ায় স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য আব্দুর নূর দুলাল,ছাদেকুল ইসলাম,মাহমুদ আলম,কাউনিয়ায় কেন্দ্রীয় নেতা মোস্তাফিজার রহমান,আশিকুর রহমান,পীরগাছা উপজেলায় কেন্দ্রীয় নেতা বাবুল আকতার, শহিদুল ইসলাম সাজু, রফিকুল ইসলাম,কালিগঞ্জ উপজেলায় কেন্দ্রীয় নেতা ড. মনোয়ারুল ইসলাম,আমিরুল ইসলাম হেলাল,মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক,আদিততমারী উপজেলায় কেন্দ্রীয় নেতা দেলোয়ার হোসেন ইঞ্জিনিয়ার, দীলীপ কুমার রায়,কুড়িগ্রামের রাজার হাট উপজেলায় স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য বখতিয়ার হোসেন শিশির, কেন্দ্রীয় নেতা মোশাররফ হোসেন, মওলানা আব্দুস সালাম,মওলানা এস,এম, জাহিরুল, রাজিকুল ইসলাম,লালমনিরহাট এডভোকেট চিত্তরঞ্জন, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুন্সি সাজু,মমতাজুর রহমান বাবু।
প্রধান উপদেষ্টা বরাবর প্রেরিত স্মারক লিপিতে বলা হয়, খরা,বন্যা ও প্রতিবছরের উপর্যুপরি ভাঙনে তিস্তা অববাহিকার ২ কোটি মানুষের জীবনে নেমে এসেছে মহাদুর্যোগ। ভাঙনে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার সরকারি- বেসরকারি সম্পদ,ঘরবাড়ি,ফসলিজমি,রাস্তাঘাট,হাটবাজার মূল্যবান অবকাঠামো পাগলা তিস্তা খেয়ে ফেলছে। হুমকিতে পড়েছে গোটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা।বাড়ছে জলবায়ু শরণার্থী উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা। নদীভাঙনে বাড়ছে রংপুর বিভাগের গড় দারিদ্র্যের হার।বালু ও পলি জমে তিস্তার বুক (মূলপ্রবাহ) সমতলের চেয়েও উঁচু হয়ে গেছে। ভাঙনের তান্ডবে নদীর প্রস্থ হয়েছে কোথাও কোথাও ৮-১০- ১২ কিলোমিটার। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় দিনদিন পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে ওঠছে।খরাকালে তিস্তার দুই তীরের বিস্তৃত জনপদে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে।তিস্তার মরণে তিস্তার শাখা ও উপনদীগুলো ( ২২ টি) হচ্ছে বেদখল, হচ্ছে তিস্তার সঙ্গে সংযোগ হারা।তিস্তা খনন ও তিস্তা সংযুক্ত শাখা প্রশাখা নদীগুলোর মুখ খুলে না দিলে ভাঙন ও উপর্যুপরি বন্যার হাত থেকে পরিত্রাণ মিলবে না। ২৪০ বছর বয়সী নদী তিস্তার জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি কোন খনন ও পরিচর্যা করা হয়নি।২০১৪ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক নদী আইন প্রণীত হয়েছে।আইন অনুযায়ী ভারত তিস্তা নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহার করতে পারে না। খরাকালে তিস্তার উজানে যতোটুকুই পানি থাক তার ন্যায্য হিস্যাটাও আমাদের প্রয়োজন।২০১৪ সাল থেকে শুস্ক মৌসুমে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে তিস্তার পুরো পানি একতরফা প্রত্যাহার করছে ভারত। উপরন্তু, পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাদের অংশের তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের আওতায় আরো তিনটি খাল খননের প্রকল্প হাতে নিয়েছে।এটি বাস্তবায়িত হলে রংপুর বিভাগের সব আন্ত:সীমান্ত নদী জলশুন্য হবে।ইতিপূর্বে সিকিমে ও পশ্চিমবঙ্গে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মিত হবার কারণে খরাকালে বাংলাদেশ অংশের তিস্তা বিরানভূমিতে পরিনত হয়েছে ।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংগঠনগতভাবে আমরা তিস্তা চুক্তি সই, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় তিস্তা খননসহ ছয়দফা দাবিতে ২০১৫ সাল থেকে আন্দোলন গড়ে তুলি। তিস্তা আন্দোলন রংপুর বিভাগের উন্নয়ন বৈষম্যের বিরুদ্ধে গণজাগরণে রূপান্তরিত হয়ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, চীনের পাওয়ার চায়না ও পানি উন্নয়ন বোর্ড তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প শীর্ষক সমীক্ষা কাজ ২০১৬- ২০১৮ সালেই শেষ করে। ইআরডি বৈদেশিক সাহায্য অনুসন্ধান কমিটির সভায় সহজ শর্তে ঋণ পেতে প্রকল্পটি পাঠানো হলেও ভারতের আপত্তিতে তা আটকে যায়। এ নিয়ে শুরু হয় ভারত- চীন দ্বৈরথ। দুই দেশের রশি টানা টানিতে প্রকল্পটি তিস্তা চুক্তির মতো ঝুলে যায়।পরবর্তীতে তিস্তা প্রকল্পে ভারত অর্থায়নের ইচ্ছা ব্যক্ত করে একটি কারিগরি দল বাংলাদেশে পাঠানোর কথা বলে।তিস্তা বাঁচাও নদী বাচাও সংগ্রাম পরিষদ ভারতের ওই কালক্ষেপণ ও দুর্ভিসন্ধির বিরুদ্ধে ৬ জুলাই ২০২৪ থেকে ১৩ জুলাই তিস্তার দুই তীরে সভা সমাবেশ এবং ১১০ টি স্থানে গণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। সংগঠনগতভাবে সূচনা পর্ব থেকেই আমাদের দাবি ছিল, অন্য দেশ অথবা সংস্থা থেকে( চীন,ভারত,জাপান,বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ) সহজ শর্তে অর্থ গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা থাকলে নিজস্ব অর্থায়নে ধাপেধাপে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার। বর্তমানে আপনি যে সামাজিক বিনিয়োগের কথা বলছেন তা আমাদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। আমরাও বলেছি সেই কথা।বলেছি,নিজস্ব অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।৫ বছর মেয়াদি এই প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হবে প্রায় ১০- ১২ হাজার কোটি টাকা।প্রতিবছরে খরচের জোগান দিতে হবে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ।এরজন্য অভ্যন্তরীণভাবে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে তিস্তা অববাহিকার দুই কোটি মানুষ নিজেরাই যথেষ্ট। পাশাপাশি দেশবাসী ও বিদেশী বন্ধুরাও এই সামাজিক বিনিয়োগে অংশ নিবেন- এটা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। এ কাজে সরকারি উদ্যোগে তিস্তা বন্ড চালু করলে মূলধন সংগ্রহের জন্য ব্যাংক অথবা বিদেশি ঋনের উপর নির্ভরশীল হতে হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের বরাদ্দকৃত বাজেটের টাকার একটি অংশ এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করা যাবে। এছাড়াও প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ইমেজকে কাজে লাগিয়ে দাতা সংস্থা ও প্রবাসীদের কাজ থেকে সহায়তা নিতে পারবেন। এই লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমরা " তিস্তা কর্তৃপক্ষ" গঠনের প্রস্তাব করছি। আপনি ডাক দিলে শিক্ষার্থীসহ সাহসী তারুণ্য এ কাজে আপনার পাশেই থাকবে।১০ আগস্ট ২০২৪ শহীদ আবু সাঈদ -এর স্বপ্নের বিদ্যাপীঠ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর-এ আপনি পরিদর্শনে এসেছিলেন।এখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্র নেতৃবৃন্দ " রংপুর বিভাগের বৈষম্য" নিরসনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দাবির মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিটিও আপনার নজরে এনেছে।আমরা মনে করি,তিস্তা প্রকল্প লাভজনক ও মানবিক প্রকল্প।ইতোমধ্যে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং তিতুমীর কলেজে অধ্যায়নরত রংপুর বিভাগের শিক্ষার্থীরা রংপুর বিভাগের উন্নয়ন বৈষম্য নিরসনে " তিস্তা মহাপরিকল্পনা" দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।
তিস্তা আন্দোলনের ছয়দফা:
১) তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন,অভিন্ন নদী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন,তিস্তা নদীতে সারা বছর পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে জলাধার নির্মাণ।
২) তিস্তা নদীর শাখা- প্রশাখা ও উপ-শাখাগুলোর সাথে নদীর পূর্বেকার সংযোগ স্থাপন ও নৌ চলাচল পুনরায় চালু।
৩) তিস্তা মহাপরিকল্পনায় তিস্তা নদী ও তিস্তা তীরবর্তী কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষায় " কৃষক সমবায় এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পকলকারখানা গড়ে তোলা।
৪)তিস্তার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণ।নদী ভাঙনের শিকার ভূমিহীন,গৃহহীন ও মৎস্যজীবীসহ উদ্বাস্তু মানুষের পুনর্বাসন।
৫)ভূমিদস্যু ও কর্পোরেট কোম্পানির হাত থেকে দখলকৃত তিস্তাসহ তিস্তার শাখা-উপনদী দখলমুুক্ত করা।নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
৬)তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং প্রকল্প এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিস্তা পাড়ের মানুষদের কর্মসংস্থান।