রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ সারাদেশ

রংপুরের পরিবহন সেক্টরের মাফিয়া মসিউর রহমান রাঙ্গা আত্মগোপনে


প্রকাশ :

আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৬ বছরের পরিবহন সেক্টরের মাফিয়া ও জাতীয় সংসদে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বাথরুমে সিসি ক্যামেরা বসানোর আহ্বানকারী মসিউর রহমান রাঙ্গা এখন ধরাছোয়ার বাহিরে আছেন।

গত ৫ আগষ্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পথ পরিবর্তনের পর জুলাই-আগষ্টে ছাত্র-জনতার আন্দালনে তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ কয়েকটি মামলা হওয়ায় তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। তিনি ১৯৯০ সালে সঞ্চিতা পরিবহন নামে একটি পুরাতন মিনিবাস কিনে রংপুর জেলা মটর মালিক সমিতিতে সদস্য হন। এর পর সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে মামা ও রওশন এরশাদকে মামী সম্বন্ধন করে আস্থাভাজন হয়ে গঙ্গাচড়া আসন থেকে তিন বার এমপি ও এক বার প্রতিমন্ত্রী হন রাঙ্গা। এর পর থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জেলা মটর মালিক সমিতি তিনি নিজের আয়ত্বে নিয়ে শুরু করেন চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহনের প্রেসিডেন্ট হন। এদিকে ঢাকা দক্ষিণের জাতীয়তাবাদি শ্রমিক দল নেতাকে হত্যাকারী মসিউর রহমান রাঙ্গাকে গ্রেফতারের দাবিতে রংপুরে পোস্টার লাগানো হয়েছে। তাকে আইনের আওতায় নেওয়ার জন্য গত ২০ সেপ্টেম্বর জেনারেল কমান্ডিং অফিসার বরাবর অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। সেই অভিযোগের অনুলিপি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, জেলা প্রশাসক, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেসটিগেশন, রংপুর দুদকসহ বিভিন্ন দপ্তরে প্রেরণ করা হয়।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ১৯৯০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত মসিউর রহমান সিলেকশনের মাধ্যমে রাঙ্গা রংপুর জেলা মটর মালিক সমিতিতে একটানা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সমিতির সকল কাজকর্ম তার কথা মত চলে। তার ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। ফলে রংপুর থেকে সকল রুটের চেইন তিনি তার বাহিনী দিয়ে তোলেন। সমিতিতে নামে মাত্র চেইনের টাকা দিয়ে সব তিনি আত্মসাৎ করেন। আর এভাবে তিনি প্রচুর টাকার মালিক বনে যান। তার আমেরিকা ও ঢাকায় একাধিক বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া তার রংপুর নগরীস্থ গুপ্তপাড়ায় বাড়ি, গঙ্গাচড়ায় বাড়ি ও রংপুরে কয়েকটি মার্কেটসহ নামে-বেনামে অঢেল সম্পত্তি আছে। অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, মসিউর রহমান রাঙ্গার অনুসারী শরিফুল আলম হিরু, আফতাবুজ্জামান লিপ্পন, আব্দুল মান্নান, এরশাদুল হক ও নিতাই সকল অবৈধ অপকর্মে সহায়তা করতেন। তারা এখনও রাঙ্গার পেতাত্তা হিসেবে কাজ করছেন। মসিউর রহমান রাঙ্গা তার নিজস্ব বাহিনী দিয়ে প্রায় ৮শ’র মত বাস থেকে যেসব রুটে চাঁদা তোলেন তা হলো- রংপুর-দিনাজপুর মেডিকেল স্ট্যান্ড ও লোকাল বাস সার্ভিস, রংপুর-দিনাজপুর ভাইস ভার্সায় প্রতিদিন ৩০টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ৭ হাজার ৫শ’ টাকা, রংপুর-বগুড়া ভাইস ভার্সায় ২৮টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে৭ হাজার টাকা, রংপুর-ফুলবাড়ী ভাইস ভার্সায় ৩০টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ৭ হাজার ৫শ’ টাকা, রংপুর-কুড়িগ্রাম ভাইস ভার্সায় ৩০টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ৭ হাজার ৫শ’ টাকা, রংপুর-রাজশাহী ভাইস ভার্সায় ১২টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ৩ হাজার টাকা, রংপুর-নীলফামারী ভাইস ভার্সায় ১০টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ২ হাজার ৫শ’ টাকা, রংপুর-উলিপুর ভাইস ভার্সায় ১০টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ২ হাজার ৫শ’ টাকা, রংপুর-ময়মনসিংহ ভাইস ভার্সায় ৪টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ১ হাজার টাকা, রংপুর-পাবনা ভাইস ভার্সায় ৪টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ১ হাজার টাকা, রংপুর-গাইবান্ধা ভাইস ভার্সায় ৩০টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ৭ হাজার ৫শ’ টাকা, রংপুর-ডালিয়া ভাইস ভার্সায় ৮টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ২ হাজার টাকা, রংপুর-পীরগঞ্জ ভাইস ভার্সায় ১০টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ২ হাজার ৫শ’ টাকা, রংপুর-ছরান-বালুয়া ভাইস ভার্সায় ২টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ৫শ’ টাকা (বর্তমান বন্ধ আছে), রংপুর-হিলি-মহিমাগঞ্জ ভাইস ভার্সায় ৩টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ৭৫০ টাকা, রংপুর-বদরগঞ্জ-পার্বতীপুর ভাইস ভার্সায় ৩০টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ৭ হাজার ৫শ’ টাকা, রংপুর-কুড়িগ্রাম লোকাল মেইল ভাইস ভার্সায়৩০টি বাসে ২৫০ টাকা হিসেবে ৭ হাজার ৫শ’ টাকা, মহিমাগঞ্জ-সাতমাথা স্ট্যান্ড/পয়েন্ট, মাহিগঞ্জ-সুন্দরগঞ্জ ভাইস ভার্সায় ৩০টি বাস থেকে ২৫০ টাকা হিসেবে ৭ হাজার ৫শ’ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এ ছাড়া মসিউর রহমান রাঙ্গার ২টি টাটা বাস সিরিয়াল চাড়াই অবৈধভাবে বগুড়া-ডালিয়া ও গাইবান্ধা রুটে চালান। এ ছাড়া রংপুরের মডার্ণ মোড় পয়েন্ট ও কামারপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে ঢাকাগামী ও ভলকা প্রায় ১শ’টি বাস থেকে চাঁদা আদায় এবং ট্রাক সমিতির কাছ থেকে প্রতিদিন ৫ হাজার টাকা নিতেন রাঙ্গার বাহিনী। জেলা মটর মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মটর মালিকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মসিউর রহমান রাঙ্গা গত ১৬ বছরে বিএনপিসহ বিরোধী দলের ডাকা রাজধারী ও অন্যান্যা বিভাগের সমাবেশের আগে যাতে লোক সমাগম হতে না পারে এজন্য কোন কারণ ছাড়াই বাস চলাচল বন্ধ করে দিতেন। কারণ যানতে চাইলে তার ওপর নেমে আসতো নানা ধরনের অত্যাচার ও নির্যাতন। সমিতিতে তার নিজস্ব লোকজন ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারতেন না। আর কথা কথায় হামলা ও মামলার ভয় দেখাতেন। এদিকে তার ক্ষমতাকালে নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি ও তদ্বির ছিল নিত্যদিনের কাজ। গঙ্গাচড়ায় চাকরি দেওয়ার নামে অনেক অসহাদের কাছ থেকে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে মসিউর রহমান রাঙ্গা পলাতক থাকায় রংপুর জেলা মটর মালিক সমিতির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে ত্রি-বার্ষিক নির্বাচন আগামী ১১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বলে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে মসিউর রহমান রাঙ্গার সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

রংপুর জেলা মটর মালিক সমিতির সাবেক সড়ক সম্পাদক বাদল বলেন, প্রতিটি নির্বাচন অনুযায়ি কমিটি গঠন করা হয়েছে। লোকাল বিভিন্ন রুটে বাস চলাচলের জন্য প্রতিমাসে লটারি হয়ে থাকে। আর চাঁদার টাকা কে নিতেন তা উনি (রাঙ্গা) জানতেন। রংপুর জেলা মটর মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি এ কে এম মোজাম্মেল হক বলেন, রাঙ্গা এই সমিতি নিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি করেছে। তিনি নিজেকে ধরাসায়ি মনে করে যা ইচ্ছে তাই করতেন। যাই হোক এখন সাধারণ বাস মালিকরা ভালো আছেন। 

রংপুর মেট্টোপলিটন পুলিশ কমিশনার মজিদ আলী বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যারা নিহত হয়েছেন তাদের মামলার সকল আসামীদের গ্রেফতার করা হবে। রাঙ্গাও এর থেকে রেহাই পাবেনা।