একসময় নিম্নআয়ের মানুষের প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম সাশ্রয়ী উৎস ছিল পাঙাশ ও তেলাপিয়া মাছ। তুলনামূলক কম দামে এসব মাছ কিনে পরিবারের প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করতেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু দিন দিন দাম বাড়তে থাকায় সেই ‘গরিবের মাছ’ও এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। রুই-কাতলার মতো মাছের দাম আগে থেকেই বেশি থাকায় পাঙাশ ও তেলাপিয়ার ওপর নির্ভরশীল নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পড়েছে বাড়তি চাপে।
রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, আকারভেদে প্রতি কেজি পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২২০ টাকায়। দুই থেকে তিন কেজি ওজনের পাঙাশের দাম কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। বড় আকারের মাছের দাম আরও বেশি। কয়েক বছর আগেও ছোট ও মাঝারি আকারের পাঙাশ প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত।
তেলাপিয়ার দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বর্তমানে মাঝারি আকারের তেলাপিয়া প্রতি কেজি প্রায় ২২০ টাকা এবং এক কেজির বেশি ওজনের বড় তেলাপিয়া ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২০২২ সালে যে তেলাপিয়ার দাম প্রতি কেজি ১৪০ টাকা থেকে শুরু হতো, বর্তমানে তা আকারভেদে প্রায় ৫৭ থেকে ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। ফলে কম দামে মাছ কিনে প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে সাধারণ মানুষের।
**প্রোটিনের চাহিদা পূরণে মাছের গুরুত্ব**
মানবদেহের বৃদ্ধি, পেশি গঠন ও ক্ষয়পূরণ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখা এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাছ উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিনের একটি সহজলভ্য উৎস। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর খাদ্যতালিকায় মাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু মাছের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে আগের তুলনায় কম মাছ কিনতে হচ্ছে। এতে দৈনন্দিন খাবার থেকে প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
দেশে মিঠাপানির মাছের উৎপাদনে চাষের মাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ময়মনসিংহ, যশোর, বগুড়া, রাজশাহী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায় বাণিজ্যিকভাবে এসব মাছ চাষ করা হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৪ লাখ ৫ হাজার টন পাঙাশ এবং ৩ লাখ ৫৪ হাজার টন তেলাপিয়া উৎপাদিত হয়েছে। দুই প্রজাতি মিলিয়ে উৎপাদনের পরিমাণ ৭ লাখ ৫৯ হাজার টন। বিপুল উৎপাদন সত্ত্বেও উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মাছ দুটির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারের বিক্রিতেও। বাড্ডা বাজারের মাছ বিক্রেতা আমিনুল ইসলাম জানান, বাজারে ক্রেতা থাকলেও আগের তুলনায় মাছ কেনার পরিমাণ কমেছে প্রায় অর্ধেক। আগে যাঁরা এক থেকে দুই কেজি মাছ কিনতেন, এখন তাঁরা আধা কেজি থেকে এক কেজি কিনছেন। এতে দাম বাড়লেও বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি মাছ বিক্রেতা আবুল কালাম জানান, মাছের খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় খামার পর্যায়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবও পড়ছে বাজারে। আগে যে ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা, এখন তা ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পরিবহনের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হওয়ায় খামার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে মাছের দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঙাশ ও তেলাপিয়ার মতো তুলনামূলক সাশ্রয়ী মাছের দাম দীর্ঘদিন বেশি থাকলে সাধারণ মানুষের মাছ খাওয়ার পরিমাণ কমে যেতে পারে। এতে দৈনন্দিন প্রোটিনের চাহিদা পূরণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিনিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাছের খাবারের দাম নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ব্যয় কমানো, সাশ্রয়ী মাছের খাবার উদ্ভাবন এবং সরবরাহব্যবস্থার অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে পাঙাশ ও তেলাপিয়ার মতো সাশ্রয়ী প্রোটিনের উৎসও ক্রমেই হারিয়ে যেতে পারে।