শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে শিউলির সুবাস আর নদীর পাড়ে কাশফুলের দোলা। প্রকৃতির এই অপরূপ সাজ দেখলেই মনে পড়ে যায় শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে ঢাকের শব্দ, আলোকসজ্জায় ঝলমল করা পূজামণ্ডপ, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো আর বিজয়া দশমীতে তাদের বাড়িতে গিয়ে মিষ্টিমুখ করার স্মৃতি। সময়ের স্রোতে জীবনের অনেক কিছু বদলে গেছে, কিন্তু শৈশবের সেই দুর্গাপূজার আনন্দ আজও মনের গভীরে অমলিন। সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন এক সামাজিক সম্প্রীতির গল্প, যা আজকের সময়েও আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।
আমার শৈশবে দুর্গাপূজা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের উৎসব ছিল না, ছিল আমাদের সবার আনন্দের উপলক্ষ। মুসলিম পরিবারের সন্তান হয়েও পূজা আসার অপেক্ষায় দিন গুনতাম। বন্ধুদের নতুন জামা হয়েছে কি না, মণ্ডপ কত সুন্দর করে সাজানো হয়েছে, কখন সবাই মিলে সেখানে যেতে পারব, এসব নিয়েই থাকত আমাদের কৌতূহল। ঢাকের শব্দ দূর থেকে ভেসে এলে মন ছুটে যেত পূজামণ্ডপের দিকে। সেই আনন্দের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের প্রয়োজন হতো না। বন্ধুত্বই ছিল আমাদের প্রবেশপত্র।
আমাদের বন্ধুত্বের জগতে ধর্মীয় পরিচয় ছিল পরিচিতির অংশ, দূরত্ব তৈরির উপাদান নয়। কে হিন্দু, কে মুসলিম, তা আমরা জানতাম; কিন্তু কে কার চেয়ে আলাদা, সেই হিসাব কষে সম্পর্ক গড়ে তুলিনি। পূজায় আমরা বন্ধুদের পাশে থাকতাম, আবার ঈদ এলে তারাও আমাদের আনন্দের সঙ্গী হতো। নতুন পোশাক দেখানো, সেমাই খাওয়া, একসঙ্গে ঘুরতে বের হওয়া কিংবা পাড়ার মাঠে খেলাধুলা, সবকিছুতেই ছিল স্বাভাবিক অংশগ্রহণ। আমাদের কাছে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় কথা।
পূজার দিনগুলোতে পাড়ার মণ্ডপ হয়ে উঠত এক মিলনমেলা। সন্ধ্যায় মণ্ডপের আলো, ঢাকের ছন্দ, ধূপের সুবাস আর মানুষের আনাগোনায় চারপাশের পরিবেশ বদলে যেত। বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে যেতাম, প্রতিমা দেখতাম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতাম। অষ্টমীর অঞ্জলি ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের ধর্মীয় আচার। আমরা সেখানে উপস্থিত থেকে তাদের বিশ্বাস ও আবেগকে কাছ থেকে দেখতাম। তাদের উপাসনার নিজস্বতা অক্ষুণ্ন রেখেই উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতাম। তখন কেউ আমাদের আলাদা করে সম্প্রীতির সংজ্ঞা শেখায়নি। একসঙ্গে চলতে চলতেই আমরা শিখেছিলাম, অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করা নিজের বিশ্বাস থেকে সরে আসা নয়।
সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে বিজয়া দশমীর কথা। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে যেন একটু বিষণ্নতা নেমে আসত। আবার সেই বিষণ্নতার মধ্যেই থাকত বন্ধুদের বাড়ি যাওয়ার, শুভেচ্ছা বিনিময়ের আর মিষ্টিমুখ করার আনন্দ। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাড়ু, নিমকি, মুড়ির মোয়া কিংবা নানা ধরনের মিষ্টি খাওয়ার স্মৃতি আজও মনে পড়লে মন ভালো হয়ে যায়। বন্ধুদের মায়েরা কী আন্তরিকভাবেই না আমাদের আপ্যায়ন করতেন! তাঁদের স্নেহে কোনো ধর্মীয় বিভাজন ছিল না। ছিল প্রতিবেশীর সন্তানের প্রতি মমতা, পরিচিত একটি শিশুকে আপন করে নেওয়ার অকৃত্রিম আনন্দ।
আজ পেছন ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, সেই সাধারণ মুহূর্তগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল অসাধারণ এক সামাজিক শিক্ষা। সম্প্রীতি শুধু বক্তৃতার বিষয় নয়, সহাবস্থানও কেবল নীতিনির্ধারণী দলিলের শব্দ নয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রতিদিনের সম্পর্কের মধ্যেই এর প্রকৃত বিকাশ। একে অন্যের বাড়িতে যাওয়া, খাবার ভাগ করে খাওয়া, আনন্দে পাশে থাকা এবং প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় পারস্পরিক আস্থা। আমাদের শৈশবের সেই সম্পর্কগুলো ছিল এই আস্থারই সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।
সময় বদলেছে, আমরাও বড় হয়েছি। জীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে, সম্পর্কের ধরন পাল্টেছে। প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগের সুযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু সব ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদ্যতা বাড়াতে পেরেছে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সন্দেহ, বিদ্বেষ কিংবা বিভাজনের খবর যখন সামনে আসে, তখন শৈশবের স্মৃতিগুলো আরও বেশি করে মনে পড়ে। ভাবি, আমরা কি পরবর্তী প্রজন্মকে সেই সহজ মানবিক শিক্ষাটি যথেষ্টভাবে দিতে পারছি? ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা, তাদের বিশ্বাসকে সম্মান করা এবং তাদের আনন্দে আন্তরিকভাবে অংশ নেওয়া যে একটি সুস্থ সমাজের স্বাভাবিক চর্চা, তা কি আমাদের সন্তানদের দৈনন্দিন জীবনে যথাযথভাবে শেখানো হচ্ছে?
সম্প্রীতি রক্ষার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়। এর শুরু পরিবারে, বিকাশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, আর পূর্ণতা পায় সামাজিক জীবনে। শিশুদের যদি ছোটবেলা থেকে শেখানো যায় যে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, কিন্তু প্রত্যেকের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা সমান গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে বিভেদের দেয়াল সহজে শক্ত হতে পারবে না। অন্যের ধর্মকে নিজের ধর্মের মতো করে গ্রহণ করতে হবে না; প্রয়োজন শুধু অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাই সহাবস্থানের সবচেয়ে মজবুত ভিত্তি।
দুর্গাপূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয় অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভের জয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রত্যয়ের কথা। এই বার্তা ধর্মীয় পরিসর ছাড়িয়ে মানবিক মূল্যবোধেরও কথা বলে। যে সমাজে মানুষ প্রতিবেশীর উৎসবকে সম্মান করে, অন্যের আনন্দে আনন্দিত হয় এবং দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ায়, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শৈশবের সেই দিনগুলো আর ফিরে আসবে না। পুরোনো পাড়ার পরিচিত মুখগুলোও হয়তো জীবনের প্রয়োজনে ছড়িয়ে পড়েছে নানা প্রান্তে। তবু স্মৃতির উঠোনে আজও ভেসে আসে ঢাকের শব্দ, চোখে ভাসে আলোকসজ্জায় ঝলমল করা মণ্ডপ, মনে পড়ে বন্ধুদের বাড়ির সেই আন্তরিক আপ্যায়ন। এসব স্মৃতি আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, সম্প্রীতি কোনো দূরবর্তী আদর্শ নয়; এটি মানুষের প্রতিদিনের আচরণে বেঁচে থাকা এক মূল্যবোধ।
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ তাই শুধু একটি সম্প্রদায়ের উৎসবের আনন্দ নয়, এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহাবস্থানের সম্ভাবনাকে নতুন করে উপলব্ধি করারও উপলক্ষ। আমাদের শৈশবের সেই সহজ সম্পর্কগুলো পরবর্তী প্রজন্মের জীবনেও ফিরে আসুক। ধর্ম থাকুক যার যার বিশ্বাসের জায়গায়, আর মানবিকতা হয়ে উঠুক সবার মিলনের সেতু। শরতের শুভ্র আকাশের মতো নির্মল হোক আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক। উৎসবের আলোয় দূর হোক সব সংকীর্ণতা, সুদৃঢ় হোক মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধন। কারণ, শৈশবে বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে যে সম্প্রীতির পাঠ শিখেছিলাম, আজও বিশ্বাস করি, সেই পাঠই পারে আমাদের আরও মানবিক, সহনশীল ও সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে।
রংপুর জেলা কমিটি’র জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত
১১ মিনিট আগে