মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাঁর সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশের পাশাপাশি মাদকবিরোধী অবস্থানের প্রশংসা করেছেন অনেকে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত মাদক ও চোরাকারবারিদের জন্য উৎসাহের কারণ হতে পারে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ইশরাক হোসেন জানান, দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানান, পদ ছাড়ার পরও বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে আরও বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবেন। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি জোরদার এবং দেশব্যাপী প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা সফরের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।ইশরাক হোসেনের পোস্টের শেষে ছিল-“মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূল! মাদক নির্মূল, মাদক নির্মূল!”
মাদকবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রশংসা
ইশরাকের পদত্যাগের ঘোষণায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সমাজকর্মী সৈকত ইসলাম পাভেল বলেন, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন কিছুটা আইন অমান্য করে থাকলেও তাঁর উদ্দেশ্য অসৎ ছিল না। হয়তো ভুলবশত তিনি নিজের বৈধ অস্ত্র উঁচু করেছিলেন। এ ঘটনার জন্য পদত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হয়নি বলে মনে করেন তিনি।
সৈকত ইসলাম পাভেল বলেন, “ইশরাকের পদত্যাগ আমাদের কাছে হতাশার। তাঁর এ পদত্যাগ মাদক ও চোরাকারবারিদের সাহস দিচ্ছে। মাদক একটি সামাজিক অপরাধ। মাদক নির্মূলে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা সময়ের দাবি।”
তিনি আরও বলেন, মাদক নির্মূলে শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, পরিবার, সমাজ, তরুণ প্রজন্ম এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্ক
রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইশরাক হোসেনের অংশ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) ঢাকা-৬ আসনের আওতাধীন এলাকায় ওই অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযানে মাদক কারবারে জড়িত সন্দেহে ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ইশরাক হোসেনের ভাষ্য, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষার জন্য তিনি ও তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা অস্ত্র উঁচু করেছিলেন। তবে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা তৈরি হয়।
ঘটনাটি নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকেও তদন্তের কথা জানানো হয়েছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ফেসবুক ও কমেন্টে সমর্থকদের নানা প্রতিক্রিয়া
ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণার পর তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যের ঘরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বেশ কয়েকজন তাঁকে পদে থাকার চেয়ে মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
Hî M El লিখেছেন, “নেতৃত্ব শুধু পদে নয়, নেতৃত্ব প্রকাশ পায় ব্যক্তিত্বে, সাহসে আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায়।” একই সঙ্গে তিনি ইশরাক হোসেনের জন্য শুভকামনা জানান।
Main Uddin Mahbub মন্তব্য করেন, “আগামিতে মেয়র হওয়ার জন্য তোমাকে তৈরি করা হচ্ছে। নিন্দুকেরা যতই নিন্দা করুক তোমাকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব।”
Shamim Ahmed লিখেছেন, “নো টেনশন ভাই আপনি আগামীবার মেয়র। আপনার মেয়র হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার।”
মাদকের বিরুদ্ধে ইশরাকের অবস্থানকে সমর্থন করে Anis Zaman মন্তব্য করেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আপনার অবস্থান আরও কঠোর থেকে কঠোর হউক! আপনার ঠাঁই হবে সাধারণ মানুষের অন্তরের মণিকোঠায়।”
Abdur Razzak লিখেছেন, “আপনি এগিয়ে যান, মাদককে যেকোনোভাবে নির্মূল করতে হবে দলমত নির্বিশেষে। যুব সমাজ একদম ধ্বংসের পথে এই মাদকের ছোবলে। আপনার উদ্দেশ্য সঠিক ছিল নিঃসন্দেহে।”
এ ছাড়া Md Salman Shah Abir ইশরাককে নেতৃত্বের জন্য যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর প্রতি সমর্থন জানান। অন্যদিকে মোস্তফা সরকার তাঁর মন্তব্যে ইশরাককে ‘রিয়েল হিরো’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বিএনপির ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন নিয়ে মন্তব্য করেন।
Soriful Islam-সহ আরও কয়েকজন ইশরাকের মাদকবিরোধী অবস্থান ও ভবিষ্যৎ ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
তবে সব মন্তব্য যে সমর্থনসূচক ছিল, তা নয়। Motiur Rahaman Billal-এর মন্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাওয়ের আহ্বান দেখা যায়। মন্তব্যটির উদ্দেশ্য সমর্থন, প্রতিবাদ নাকি ব্যঙ্গ—তা স্পষ্ট নয়।
পদ ছাড়লেও মাদকবিরোধী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষনা
ইশরাক হোসেন তাঁর পোস্টে স্পষ্ট করেছেন, প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর কার্যক্রম থামবে না। বরং এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে আরও বেশি উদ্দীপনা নিয়ে মাদকবিরোধী কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
তিনি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় সফর করে প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন।
এদিকে সমাজকর্মী সৈকত ইসলাম পাভেল মনে করেন, ইশরাকের মতো রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিদের মাদকবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত থাকা তরুণ সমাজের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, “মাদক কোনো দলীয় বিষয় নয়। এটি একটি সামাজিক অপরাধ। তাই মাদক নির্মূলে দলমত নির্বিশেষে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”
মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, মাদকের সরবরাহ বন্ধ এবং তরুণ সমাজকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক থাকলেও তাঁর মাদকবিরোধী অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে, তাতে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তাই সামনে এসেছে।
দুপুর ২টায় পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন ইশরাক
১৮ ঘন্টা আগে