বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

সর্বজনীন পেনশনে আসছে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ


প্রকাশ : (৮ ঘন্টা আগে)
সর্বজনীন পেনশনে আসছে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য নতুন কোনো পঞ্চম স্কিম চালু না করে বিদ্যমান চারটি স্কিমের প্রতিটিতেই শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে গ্রাহকেরা প্রচলিত পদ্ধতি অথবা শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালুর পর এখন পর্যন্ত চারটি স্কিমে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার মানুষ নিবন্ধন করেছেন। এসব গ্রাহকের জমা হওয়া প্রায় ৩২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

চারটি স্কিমের মধ্যে ‘সমতা’তে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ স্কিমে প্রায় ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন নিবন্ধন করেছেন। অন্যদিকে ‘সুরক্ষা’, ‘প্রগতি’ ও ‘প্রবাস’ স্কিমে নিবন্ধন তুলনামূলক কম।

চার স্কিমেই থাকবে শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প

সর্বজনীন পেনশনে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং সুদভিত্তিক বিনিয়োগ এড়িয়ে চলতে চান এমন গ্রাহকদের সুযোগ দিতে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। পাশাপাশি নতুন ব্যবস্থার আইনগত ভিত্তি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় আইনের খসড়া প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ কামরুল হাসান জানান, শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি আলাদা কোনো পঞ্চম স্কিম হবে না। বিদ্যমান চারটি স্কিমের ইসলামিক ভার্সন হিসেবেই এটি চালু করা হবে।

অর্থাৎ ‘প্রবাস’ স্কিমের পাশাপাশি ‘প্রবাস শরিয়া’, একইভাবে ‘প্রগতি’, ‘সুরক্ষা’ ও ‘সমতা’ স্কিমেও শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের বিকল্প থাকবে। এতে গ্রাহকেরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী প্রচলিত মুনাফা পদ্ধতি অথবা শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি বেছে নিতে পারবেন।

সুকুকসহ বিকল্প বিনিয়োগ বিবেচনায়

বর্তমানে সর্বজনীন পেনশনের তহবিল সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থায় সুদ গ্রহণের সুযোগ না থাকায় নতুন ধরনের বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সুকুক, শরিয়াহসম্মত ব্যবসা ও শেয়ারে বিনিয়োগের পাশাপাশি হালাল ব্যবসায় মুদারাবা বা মুশারাকা পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়গুলো বিবেচনায় রয়েছে। তবে দেশে সুকুকের বাজার এখনো তুলনামূলক ছোট। ফলে পর্যাপ্ত শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির কাঠামো, পরিচালন ব্যবস্থা, বিনিয়োগ নীতি ও কারিগরি বিষয় নির্ধারণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং স্থানীয় পরামর্শকেরা কাজ করছেন। একই সঙ্গে এ ব্যবস্থার আর্থিক স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি দায়ও পর্যালোচনা করা হবে।

শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতিতে আলাদা শরিয়া বোর্ড গঠন করা হবে কি না এবং সুকুকসহ কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করা যাবে, তা নিয়েও পর্যালোচনা চলছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শরিয়া কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

আস্থা অর্জন হবে বড় বিষয়

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালু করলেই গ্রাহকের আস্থা তৈরি হবে না। তহবিল কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে, কীভাবে মুনাফা অর্জিত হচ্ছে এবং শরিয়াহ নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা গ্রাহকদের কাছে স্পষ্ট করতে হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক মো. আহসান হাবীব বলেন, দেশের একটি অংশ সুদভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থায় অংশ নিতে অনাগ্রহী হতে পারেন। তাই গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য বা বিনিয়োগ পদ্ধতির সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

তিনি মনে করেন, শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ, মুনাফার হার এবং গ্রাহকের আস্থা তৈরির ওপর। এ ক্ষেত্রে স্বাধীন শরিয়াহ বোর্ড, নিয়মিত শরিয়াহ অডিট এবং বিনিয়োগের বিষয়ে স্বচ্ছ প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পেনশন ব্যবস্থায় আরও পরিবর্তনের উদ্যোগ

শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির পাশাপাশি সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে আরও কিছু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো পেনশনার মারা গেলে তাঁর স্বামী বা স্ত্রী আগের নিয়মের ৭৫ বছরের পরিবর্তে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পাওয়ার সুযোগ পাবেন। পেনশনার নিজেও জীবদ্দশায় আজীবন পেনশন পাবেন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন যেসব প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির কর্মীরা প্রচলিত সরকারি পেনশনের আওতায় নেই, তাঁদের ‘প্রগতি’ স্কিমে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশগামী কর্মীদের ‘প্রবাস’ স্কিমে যুক্ত করতে বিদেশ যাওয়ার আগে তাঁদের এ বিষয়ে অবহিত করা এবং বিমানবন্দরে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সর্বজনীন পেনশনে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রণোদনাও বাড়ানো হয়েছে। আগে ১৫ টাকা দেওয়া হলেও এখন তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।

এদিকে পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করা, পেনশন তহবিল থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ এবং স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করার বিষয়ও পর্যালোচনা করছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।

তবে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি এখনো আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। আইনগত কাঠামো চূড়ান্ত করে জাতীয় সংসদে পাঠানো এবং পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই এর বাস্তবায়নের পথ তৈরি হবে।

সূত্র: ইত্তেফাক/এসএ

বিজ্ঞাপন