সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

মরিয়মের চিঠিতে ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ ও শেষ সময়ের নানা ইঙ্গিত


প্রকাশ : (১ ঘন্টা আগে)
মরিয়মের চিঠিতে ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ ও শেষ সময়ের নানা ইঙ্গিত

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা- আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁর হাতে লেখা কয়েকটি চিঠি সামনে এসেছে। জাতীয় সংসদের প্যাড, সাদা কাগজ বিভিন্ন রঙের কালিতে লেখা এসব চিঠিতে ভালোবাসা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিশ্বাসভঙ্গ, আক্ষেপ আত্মমর্যাদার নানা কথা উঠে এসেছে।

উদ্ধার হওয়া একটি চিঠিতে মরিয়ম নিজের সম্পর্ককে যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, অতিরিক্ত বিশ্বাস করে তিনি যুদ্ধে নেমেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিততে পারেননি। বরং যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে যাকে নিজের পক্ষের মানুষ মনে করেছিলেন, তাকেই বিপক্ষ দলের সেনাপতি হিসেবে দেখতে হয়েছে।

চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী, সম্পর্কের শুরুতে তাঁর মধ্যে গভীর বিশ্বাস প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। কারণে নিজেকে পরাজিত মনে করেছেন তিনি।

অন্য একটি সাদা কাগজে লেখা চিঠিতে ভালোবাসা সম্পর্কের অধিকার নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন মরিয়ম। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, ওই ব্যক্তি অন্য এক নারীর স্বামী ছিলেন এবং আইনগত সামাজিক অধিকার ছিল তাঁর স্ত্রীর। নিজেকে সেখানেবোকাহিসেবে উল্লেখ করে সম্পর্কটির পরিণতি নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন তিনি।

ওই লেখায় আরও বলা হয়েছে, কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের। ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয় বলেও সেখানে উল্লেখ রয়েছে। এতে সম্পর্কের প্রতি তাঁর প্রত্যাশা এবং সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার কষ্ট ফুটে উঠেছে।

আরেকটি চিঠিতে বন্ধুত্বের প্রসঙ্গ এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, তাঁকেবন্ধুহওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং পরে একটি খেলায় অংশ নেওয়ার কথা বলা হয়। সরল বিশ্বাসে তিনি তাতে রাজি হন। কিন্তু পরে তাঁর উপলব্ধি হয়, ওই খেলায় তিনিই ছিলেন দাবার একটি গুটি।

চিঠির এই অংশে মরিয়মের বিশ্বাসের সুযোগ নেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর নিজের অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। তবে ওই লেখায় যেসব অভিযোগ বা ইঙ্গিত রয়েছে, সেগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়।

আরেকটি চিঠিতে বিশ্বাস করে প্রতারিত হওয়ার ক্ষোভ আরও তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে মরিয়ম লিখেছেন, তিনি হেরেছেন এবং অপর পক্ষ জিতেছে। কারণ তিনি বিশ্বাস করেছিলেন বলেই তাঁকে ঠকানো সম্ভব হয়েছে। একই লেখায় ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে সতর্কবার্তার ভাষাও রয়েছে।

লাল কালিতে লেখা একটি ছোট নোটে নিজের আত্মমর্যাদার কথাও উল্লেখ করেছেন মরিয়ম। সেখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, মায়ায় পড়ে কাউকে গুরুত্ব দিলেও তাঁকে দুর্বল বা সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন মানুষ ভাবা ঠিক নয়।

চিঠিগুলোর সঙ্গে ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখ লেখা একটি আলাদা পাতাও পাওয়া গেছে। সেখানে ঘুমানোর আগে পড়ার জন্য কয়েকটি ধর্মীয় আমলের কথা লেখা রয়েছে। কালেমা, দরুদ শরিফ, আয়াতুল কুরসি, বিভিন্ন দোয়া ইস্তিগফারের কথা ওই পাতায় উল্লেখ করা হয়েছে।

চিঠিগুলোর ভাষা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একই সময়ে মরিয়মের লেখায় ভালোবাসা, মায়া, বিশ্বাস, আক্ষেপ, আত্মমর্যাদা ক্ষোভের প্রকাশ রয়েছে। কোথাও সম্পর্ক ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা, আবার কোথাও সম্পর্ক থেকে সরে আসার দৃঢ়তার কথাও রয়েছে।

যেভাবে সামনে আসে মৃত্যুর ঘটনা

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। ঘটনাস্থলে ফরেনসিক দলের সদস্যরাও কাজ করেন।

ঘটনার পর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা খানমকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে ঘটনায় মামলা গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

এর আগে জুলাই মাসে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক তরুণীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি ওই তরুণীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন হিসেবে পরিচয় দেন। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সামাজিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।

মরিয়মের মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া চিঠিগুলো সামনে আসায় ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে চিঠিতে সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিশ্বাসভঙ্গ, মানসিক কষ্ট ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে লেখা কথাগুলো তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে চিঠিতে লেখা বক্তব্যকে মরিয়মের ব্যক্তিগত অনুভূতি অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। শুধু এসব চিঠির ভিত্তিতে তাঁর মৃত্যুর কারণ কিংবা কারও দায় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

চিঠিগুলো সত্যিই মরিয়মের লেখা কি না, কখন লেখা হয়েছিল, কাকে উদ্দেশ করে লেখা হয়েছিল এবং তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে এসব লেখার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাতের লেখা পরীক্ষা, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ফরেনসিক আলামত, মোবাইল ফোন অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই ঘটনার প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হওয়ার কথা।

 

বিজ্ঞাপন