১৯৭২ সালে বদরগঞ্জ কলেজের ছাত্রাবস্থায় রংপুরের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আশরাফ হোসেন বড়দা সম্পাদিত ও রংপুর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বিদ্রোহী পত্রিকার মাধ্যমে আমার সাংবাদিকতা জীবনে হাতে খড়ি। এইচএসসি (বিজ্ঞান) বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে রংপুর কলেজে ভর্তি হলাম।
১৯৭৩ সালে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার গণমানুষের নেতা, ঘেরাও আন্দোলনের প্রবক্তা, ফায়ার ইটার মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী দেশব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে রংপুরে আসেন। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় প্রচারণা এবং উত্তরবঙ্গের খাদ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই সফর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
পত্রিকার সম্পাদকসহ আমি তৎকালীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নেতা সেলিম চৌধুরীর রংপুরস্থ মুলাটোলের বাসায় যাই। মাওলানা ভাসানীর সফরসঙ্গী ছিলেন ন্যাপ নেতা কাজী জাফর আহমেদ (পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী)। আমরা হুজুরকে সালাম দিয়ে পরিচয় দিলাম। মাওলানা ভাসানী লম্বা হয়ে শুয়ে আছেন। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার এক ভক্ত পা টিপছেন। পাশের বেতের সোফায় কাজী জাফর আহমেদ ও অন্যান্য ন্যাপ নেতৃবৃন্দ বসে আছেন। দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বামপন্থী, অতি-বামপন্থীদের কার্যক্রমসহ অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে হুজুর উত্তর দিচ্ছেন, আবার চিলমারী থেকে আগত ভক্তকে জিজ্ঞেস করছেন, তার মুরিদরা কে কেমন আছে? সংসার ঠিকমতো চলছে কি না? সন্তানেরা কে কী অবস্থায় আছে? ইত্যাদি ইত্যাদি।
হুজুর প্রস্রাব করতে ওয়াশরুমে যাবেন। খাট থেকে পা হেলিয়ে দিয়েছেন, সোফায় বসা ন্যাপ নেতা কাজী জাফর আহমেদ অত্যন্ত তামিজের সঙ্গে হুজুরের পায়ে স্যান্ডেল দিয়ে দিলেন। হুজুর ওয়াশরুম থেকে ফিরে আবারও শুয়ে পড়লেন। আলোচনা চলছে। পত্রিকা প্রকাশের সংবাদ শুনে অত্যন্ত খুশি হয়ে ধন্যবাদ দিলেন। হুজুর বললেন, গণচীনের লং মার্চের পূর্ব থেকে ৭২ হাজার কমিউন থেকে হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করা হতো। এই পত্রিকায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি, করণীয়, পার্টির রণনীতি এবং রণকৌশলসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশ করা হতো। এতে চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কর্মী ও গণমানুষের মাঝে সেতুবন্ধন রচিত হতো। সেই দিনের মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর বক্তব্যে উজ্জীবিত হয়ে সাংবাদিকতায় নিয়োজিত হলাম। মফস্বল সাংবাদিকতায় ঢুকে মামলা, হামলা, নির্যাতন, নিপীড়ন, চরম অর্থনৈতিক দৈন্যতা, অবজ্ঞা, অবহেলা, অত্যাচার, ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চনাসহ দুর্বিষহ জীবন কাটালাম। এতোমধ্যে দৈনিক বার্তা , দৈনিক ইত্তেফাক, নিউনেশনসহ অন্যান্য পত্রিকা এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছি। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত লালমনিরহাট বার্তা ও লালমনিবার্তা অনলাইনের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেই চলছি।
বিকেলে ভাসানী হুজুর, কয়েকজন ন্যাপ নেতা ও বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের একজন নেত্রীসহ জীপে চড়ে রংপুর শহরে ঘুরতে বের হলাম। প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণের একপর্যায়ে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী বিউটি বেগম বললেন হুজুর, আমরা মিষ্টি খাব। হুজুর বললেন, জীপে ন্যাপের কেউ আছো? তদুত্তরে রংপুরের সনামধন্য আইনজীবী আবুল হোসেনের পুত্র ন্যাপ নেতা আব্দুল হালিম বললেন হুজুর, আমি হালিম আছি।
হুজুর বললেন, এদেরকে মিষ্টি খাওয়াও। হালিম ভাই বললেন, হুজুর, সামনে (বর্তমান প্রেসক্লাব ভবনের পাশে) আমাদের ন্যাপের কবির ভাইয়ের মিষ্টির দোকান আছে। সেখানে জীপ থামলে হুজুর বের হয়ে দোকানের দিকে হাঁটা দিলেন। হুজুরকে দোকানে আসতে দেখে কবির ভাই দ্রুত চেয়ার থেকে উঠে আবেগে আপ্লুত হয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলেন। হুজুর বললেন, এদেরকে মিষ্টি খাওয়াও। কবির ভাই মিষ্টির বিরাট গামলা হুজুরের সামনে ধরলেন, তাঁর চোখে আনন্দ অশ্রু। হুজুর অবশ্য মিষ্টি খেলেন না। আমরা মিষ্টি খেয়ে আবারও জীপে উঠে সেলিম চৌধুরী ভাইয়ের বাসায় ফিরে এলাম।