আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড আকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত এনইসি সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের কার্যপত্র অনুযায়ী, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নসহ মোট উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
এবারের উন্নয়ন কর্মসূচিতে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন, বিচার ও আইনগত সেবা সম্প্রসারণ, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট উন্নয়ন বাজেটের ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা।
মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক বরাদ্দে সর্বোচ্চ অর্থ পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার বরাদ্দ ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।
তবে এবারের উন্নয়ন কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে ‘থোক বরাদ্দ’। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা অনির্দিষ্ট খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিপরীতে সরাসরি প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতেও প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দের তুলনায় থোক বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি রাখা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় পরিবার কার্ড কর্মসূচির জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, কৃষক কার্ডের জন্য ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং মসজিদ ও উপাসনালয়ের দায়িত্ব পালনকারীদের সম্মানীর জন্য ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট ১ হাজার ১২১টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৪৯টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১০৭টি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে ৪৩টি প্রকল্প রয়েছে। এছাড়া নতুন ১ হাজার ২৭৭টি অননুমোদিত প্রকল্পও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
তবে বড় আকারের এ উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার হয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। এ বাস্তবতায় নতুন এডিপি কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
সভায় প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং জুন ২০২৭ সালের মধ্যে সমাপ্তিযোগ্য প্রকল্প দ্রুত শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, নতুন উন্নয়ন কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।