রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

ফারাক্কা লংমার্চের চেতনা: পানি, প্রকৃতি ও জাতীয় অধিকার রক্ষার সংগ্রাম


প্রকাশ :

পানি প্রকৃতির এক অনন্য আধার। সৃষ্টিকর্তার অমূল্য নিয়ামতগুলোর মধ্যে পানি অন্যতম, যা আমরা প্রায় বিনামূল্যে ভোগ করে থাকি। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই মানুষ বাধাহীনভাবে পানির অধিকার ভোগ করে এসেছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, এই পানি নিয়েও অসংখ্য সংঘাত ও যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। অনেকে মনে করেন, আজ বিশ্বব্যাপী তেল নিয়ে যে সংঘাত চলছে, অদূর ভবিষ্যতে তা রূপ নেবে মিঠা পানির যুদ্ধে। তাই পানি নিয়ে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা আজ বিশ্বশান্তির অন্যতম পূর্বশর্ত।

যারা এই ন্যায়কে অস্বীকার করে, তারা মানবতা, প্রাণ ও পরিবেশের শত্রু। কারণ প্রাণ ও পরিবেশ রক্ষা রবুবিয়াতের মূল শিক্ষা। প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান মানে সৃষ্টিকর্তার অমোঘ নিয়মের বিরুদ্ধাচরণ। ইতিহাস বলে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কোনো শক্তিই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি।

এই সত্যই উপলব্ধি করেছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে তিনি ফারাক্কা লংমার্চের ডাক দিয়ে বিশ্বজনমতের সামনে মানবতার এক অনন্য গাথা রচনা করেন। তিনিই প্রথম ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের সম্ভাব্য মরুকরণের বিপদ সম্পর্কে জাতিকে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা বাঁধের পরিণতি হিরোশিমা-নাগাসাকির চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। তখন অনেকেই তাঁর এই দূরদর্শিতাকে বাড়াবাড়ি বলে মনে করেছিলেন। অথচ আজ বাস্তবতা তাঁর সতর্কবার্তাকেই সত্য প্রমাণ করেছে।

জীবনের শেষ প্রান্তে, শারীরিকভাবে ভীষণ অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তিনি থেমে থাকেননি। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে সময় খুবই অল্প। আহমদ ছফার ভাষায়, “বাংলাদেশের সর্বনাশ ঘটছে—এটা তাঁর চেয়ে স্পষ্ট করে আর কেউ বুঝতে পারেনি।” তাই ৯৬ বছর বয়সেও তিনি সকল বিভেদ, অনৈক্য ও জড়তা ভেঙে জনগণকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান।

ফারাক্কা লংমার্চ ছিল কেবল একটি মিছিল নয়; এটি ছিল জাতীয় জাগরণ, জাতীয় ঐক্য এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এটি ছিল জুলুমের বিরুদ্ধে মজলুমের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ডাক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর সেই ঐক্য ধরে রাখা যায়নি। পানি বণ্টনের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য যে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন ছিল, তা আজও গড়ে ওঠেনি।

আমরা ভুলে যাই, নদী ও পাখির কোনো সীমান্ত নেই। পানির প্রশ্নকে যারা কেবল ভারতপ্রীতি বা ভারতবিরোধিতার সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন, তারা সমস্যার গভীরতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। এটি কেবল রাজনৈতিক সমস্যা নয়; এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার প্রশ্ন।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হলো, যাদের আমরা রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব দিই, তাদের অনেকেই জাতীয় সংকটকে উপেক্ষা করে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যস্ত থাকেন। অথচ এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষই এ দেশের প্রকৃত শক্তি। তাই পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের আন্দোলনে সাধারণ মানুষকেই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

আন্তর্জাতিক আইনও বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলে। ২০১৪ সালের ১৭ আগস্ট কার্যকর হওয়া আন্তর্জাতিক নদীধারা সনদ অনুযায়ী, কোনো উজানের দেশ এমনভাবে আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহার করতে পারে না যাতে ভাটির দেশের ক্ষতি হয়। ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও বিধান রয়েছে। বিস্ময়ের বিষয়, বাংলাদেশ এখনো এই সনদ অনুসমর্থন করেনি। অথচ এটি আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।

খোদ ভারতের ভেতরেও ফারাক্কা ব্যারাজের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে প্রতিবাদ হচ্ছে। বিহারে ব্যারাজ অপসারণের দাবিতে আন্দোলন হয়েছে, আদালতে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন মহলও এই ব্যারাজের ক্ষতিকর দিক স্বীকার করছে। ফলে এ লড়াই কোনো দেশ বা জাতির বিরুদ্ধে নয়; এটি প্রকৃতিবাদীদের পক্ষে, মানুষ ও পরিবেশবিনাশী নীতির বিরুদ্ধে এক মানবিক সংগ্রাম।

দুঃখজনকভাবে আমরা এখনো জাতীয়ভাবে এই প্রশ্নে সোচ্চার হতে পারিনি। বর্ষায় ডুবে যাই, খরায় পুড়ি; তবুও ন্যায্য হিস্যার দাবিতে শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হই। অথচ প্রতিবেশী নেপাল তাদের জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানাতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের কি তবে দেশপ্রেম শেখার জন্য অন্যের দিকে তাকাতে হবে?

ফারাক্কা আন্দোলনকে যারা কেবল একটি দিবস বা মিছিল বলে মনে করেন, তারা এর অন্তর্নিহিত শক্তি উপলব্ধি করতে পারেননি। স্বাধীনতা কেবল ভৌগোলিক অখণ্ডতার নাম নয়; অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার নামই প্রকৃত স্বাধীনতা।

আজ সময়ের দাবি—মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চের চেতনায় নতুন করে জাগ্রত হওয়া। জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে, আন্তর্জাতিক আইনের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে, কূটনৈতিক তৎপরতা ও গণআন্দোলনের মাধ্যমে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে।

সেই দিন খুব দূরে নয়, যেদিন বাংলার মানুষ আবারও দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করবে—খামোশ।