স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার প্রতিশ্রুতি সরকারের; স্বাস্থ্য খাতে ৮০ শতাংশ নারী কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, শিক্ষা ও নেতৃত্ব বিকাশে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান।
তিনি বলেছেন, নারীর অগ্রগতি শুধু কতজন নারী শীর্ষ পদে পৌঁছেছেন, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং আরও কত নারী তাঁদের অনুসরণ করার সুযোগ পাচ্ছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের নারীদের জন্য সুযোগ কতটা উন্মুক্ত হচ্ছে, তার ওপরই প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ওম্যান লিডারশিপ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ৩০তম ইউএস ট্রেড শোর অংশ হিসেবে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) ও ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
বক্তব্যে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। অথচ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে বিপুলসংখ্যক নারী এখনো মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পারছেন না। বাল্যবিয়ে, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব নারীদের সম্ভাবনা বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৫ সালের হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশের ৯০ হাজার ৪৯টি গ্রামের কোটি কোটি নারী এখনো অর্থনীতির মূলধারায় পর্যাপ্তভাবে যুক্ত হতে পারছেন না।
শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রীদের ঝরে পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যানবেইসের ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ছাত্রী ঝরে পড়ে। উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের হার ২০ দশমিক ৮ শতাংশ। তাই বিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মসংস্থান পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নারীদের জন্য ধারাবাহিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
জুবাইদা রহমান বলেন, শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। নারীদের সাক্ষরতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক দক্ষতায় শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি প্রশ্ন করা, উদ্ভাবন এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করেছিলেন।
দেশব্যাপী ‘নতুন কুঁড়ি’ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজন শিশুদের, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা ও সহমর্মিতার মতো গুণাবলি তৈরি হচ্ছে।
নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে জুবাইদা রহমান বলেন, একজন নারীর আয়, সঞ্চয় এবং নিজস্ব আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সুযোগ বাড়ায় না, পরিবারের সামগ্রিক সক্ষমতাকেও শক্তিশালী করে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু আয়ের বিষয় নয়; বরং নিজের ভবিষ্যৎ নিজে গড়ে তোলার ক্ষমতা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার ৮০ শতাংশই নারী। পাশাপাশি নারী ও শিশুর উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
নারীদের কর্মজীবন নির্বিঘ্ন করতে দেশজুড়ে দিবাযত্ন কেন্দ্র (ডে-কেয়ার সেন্টার) গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, পারিবারিক দায়িত্ব কোনো নারীর ক্যারিয়ার ও পেশাগত অগ্রগতির পথে বাধা হওয়া উচিত নয়। কর্মক্ষেত্রে নতুন দক্ষতা অর্জন এবং দীর্ঘ বিরতির পর কাজে ফিরে আসার সুযোগও নারীদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে।
প্রযুক্তির পরিবর্তিত বাস্তবতা তুলে ধরে জুবাইদা রহমান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল সেবা ও নতুন প্রযুক্তি কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে আগামী দিনের অর্থনীতি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদ্ভাবনী হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, নারীর অগ্রগতি নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মেয়েদের বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে।
অনুষ্ঠানে মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জাকিয়া সুলতানার সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন। এ ছাড়া প্যানেল সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের অ্যাক্টিং ডেপুটি চিফ অব মিশন তৃশিতা মোওলা, শেভরন বাংলাদেশের সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং এবং ওরাকলের বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুবাবা দৌলা।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে জুবাইদা রহমান নারীদের অর্জন উদযাপনের পাশাপাশি তাঁদের অগ্রগতির পথে থাকা প্রতিবন্ধকতা দূর করার আহ্বান জানান। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নারীদের আকাঙ্ক্ষাকে সুযোগে, সুযোগকে নেতৃত্বে এবং নেতৃত্বকে দেশের টেকসই উন্নয়নে রূপান্তর করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সূত্র: বাসস