মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় আগ্রহী করে তুলতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের দুটি শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চারটি পাঠ্যবই। বইগুলোতে খেলাধুলা, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা এবং কারিগরি দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) উদ্যোগে প্রণীত বই চারটি হলো চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’।
এনসিটিবি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন বইগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি এবং বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে চারটি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি মুদ্রণ করা হবে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বাসসকে জানান, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এনসিসির সভায় অনুমোদনের পরপরই বইগুলোর বিষয়বস্তু মুদ্রণের জন্য পাঠানো হবে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু জানান, আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি বই মুদ্রণের কাজ শেষ করার আশা করা হচ্ছে।
খেলাধুলা: সুস্থ জীবন ও আত্মরক্ষার শিক্ষা
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রণীত ‘খেলাধুলা’ বইটি সাজানো হয়েছে ১৪টি অধ্যায়ে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলায় আগ্রহী করে তোলা এবং সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।
বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবার মতো খেলার নিয়মকানুন তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো আত্মরক্ষামূলক কৌশল সম্পর্কেও শিক্ষার্থীরা জানার সুযোগ পাবে।
খেলার মাঠে বা দৈনন্দিন জীবনে আঘাত পাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া কিংবা হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে করণীয়ও তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে। পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসা, পুষ্টি, সামাজিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি: ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়
চতুর্থ শ্রেণির আরেকটি নতুন বই ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’। ১১টি অধ্যায়ে সাজানো বইটিতে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বাংলা বর্ণমালা চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পিঠাপুলির ঐতিহ্যের পাশাপাশি পারিবারিক সহযোগিতা ও যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ও স্থান পেয়েছে।
এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের ছবি যুক্ত করার কথা রয়েছে।
লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস: আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ছয়টি অধ্যায়ে প্রণীত হয়েছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি। পড়াশোনার ভীতি কমিয়ে আনন্দময় পরিবেশে শেখার সুযোগ তৈরি করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য।
প্রচলিত মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির বাইরে গিয়ে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জ্ঞান অর্জনের ধারণা তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে। নিজের স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়েও যে শেখা সম্ভব, তা শিক্ষার্থীদের বোঝানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আমার কারিগরি শিক্ষা: দক্ষতা অর্জনে হাতে-কলমে শেখা
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য আটটি অধ্যায়ে তৈরি করা হয়েছে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন, সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার মানসিকতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপনের মতো বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তবে কী করা সম্ভব, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর প্রাথমিক রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের পরামর্শে পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ শ্রেণিতে খেলাধুলা ও সংস্কৃতি বিষয় দুটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এগুলো প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম শওকত আলী খান বলেন, নতুন পাঠ্যপুস্তক চালু হলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।
সূত্র: বাসস
হঠাৎ অসুস্থ তিন মন্ত্রী
১ দিন আগে