রংপুরে ১৭ বছর পর জামায়াতে ইসলামীর বিভাগীয় জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আগে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সেজন্যই আমরা সংস্কারের কথা বলছি। মৌলিক সংস্কার ছাড়া ভালো নির্বাচন সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতে কিসের নির্বাচন।আগে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে,অবশ্যই রাজনৈতিক সংস্কার করতে হবে এবং সবার অংশ গ্রহণে একটি ভালো ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। দেশে এখন মব পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিকে কীসের নির্বাচন! এই অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আমরা সব সময় মব পলিটিক্সের ঘোর বিরোধী।এটা ১৯৭২ সাল থেকেই আমরা বলে আসছি।আমাদের চোখের সামনে, এখন দেশের এই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই অবস্থায় কোনো ভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।দেশটা কেউ কেউ পাটগ্রাম বানিয়ে ফেলছে যার কারনে বর্তমান সময়ে সুষ্ঠ নির্বাচনের কথা কল্পনাও করা যায় না। তবে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কতগুলো মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন রয়েছে। সেই মৌলিক সংস্কারের কথা আমরা বলেছি। আমরা মৌলিক সংস্কার করে ছাড়বো এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।আমরা সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির লক্ষে আমরা সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছি।
শুক্রবার (৪ জুলাই) বিকেলে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রংপুর মহানগরের আমির এটিএম আজম খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির এসব কথা বলেন। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যূত্থানের সব খুনির বিচার, প্রয়োজনীয় সব সংস্কারের পর নির্বাচনসহ চার দফা দাবিতে জনসভার আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রংপুর মহানগর ও জেলা শাখা।
জামায়াতের আমীর বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা শুনতে পাচ্ছি। আমরা সবাইকে স্মরণ করে দিতে চাই। কেউ যদি আওয়ামী ফ্যাসিবাদের আমলের মতো স্বপ্ন দেখে থাকেন। তাহলে বলতে চাই, মহান আল্লাহর সাহায্যে আমরা সেই স্বপ্নকে দুঃস্বপ্ন করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এমন কিছু বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না দেশে কোন মাস্তান তন্ত্র চলবে না, কালো টাকার খেলা চলবে না। প্রশাসনের ক্যু চলবে না। নির্বাচনের সময় কেউ যেন অপকর্ম করতে না পারে। এজন্য আমরা সজাগ রয়েছি। জনগনের ভোটে সুষ্ঠভাবে নির্বাচনে যারাই জয়ী হবে তাদের স্বাগত জানাতে এখন থেকেই আমরা প্রস্তুত। আমরা বলতে চাই,ফ্যাসিষ্ট হাসিনার হাতে সব বাহিনী ছিলো। জনবিষ্ফোরনের কারনে ক্ষমতা আটকাতে পারেনি পালিয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদের নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।
তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৪ বছর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সাধ্য মতো জনগণের সুখে দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। জনগণের প্রত্যেকটি ন্যায় দাবি আদায়ের জন্য সমানতালে ঘরে বাইরে লড়াই করেছে। এদেশের জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির অধ্যাপক গোলাম আযম সর্বপ্রথম কেয়ারটেকার সরকারের প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছিলেন। যার ভিত্তিতে ১৯৯১ সালে একটা, পরপর আরো দুটি-তিনটি নির্বাচন হয়েছে। তারপর থেকে সেই কেয়ারটেকার সরকারকে খেয়ে ফেলা হয়েছে।
বিএনপিকে ইঙ্গিত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আবু সাঈদদের শাহাদতের জীবন বাজি রাখা লড়াই এবং জীবন উৎস্বর্গ করার বিনিময়ে আজকে বাংলাদেশের মানুষ আমরা যারা মুক্তি পেলাম, তারা কেন ধৈয্য ধরতে পারছি না। চতুর্দিকে পত্রিকার পাতা খুললে, স্যাটেলাইট মিডিয়ার সামনে দাঁড়ালে-বসলে আজকে বাংলাদেশের কোনো না কোনো এলাকায় আমরা বিভৎস কিছু মানুষের থাবা দেখতে পাচ্ছি। আমার মায়ের ইজ্জ্বতের ওপর এই থাবা দেখছি। মানুষের জীবনের ওপর এই থাবা দেখছি। জনগণের সম্পদের ওপর এই থাবা দেখছি। এমনকি দিশেহারা হয়ে তাদের যখন হুশ ঠিক থাকে না তখন নিজের লোককেও নিজেরা খুন করতে কুষ্ঠাবোধ করে না। কেনরে ভাই, তোমাদের এই অবস্থা?
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংখ্যালঘুদের নিয়ে যারা মায়া কান্না করেছে, তারাই সংখ্যালঘুদের সম্পদ লুট করেছে। আমরা দেশের মধ্যে সংখ্যালঘু ও সংখ্যা গরিষ্ঠতা মানি না। এ দেশের মাটিতে যারাই জন্ম গ্রহণ করবে, তারাই এদেশের সম্মানিত নাগরিক। আমরা কথা দিচ্ছি, সংবিধান অনুযায়ী আমরা মানুষের পাশে দাঁড়াবো।তারা মালিক হয়েছিলো জনগনের।আমরা জনগণের সেবক হবো ইনশাআল্লাহ।
ডা. শফিকুর রহমানে বলেন, মদিনার ছায়ার আলো এই বাংলাদেশে আমরা দেখতে চাই। শরিয়ার কথা শুনলে অনেকে গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে যায়। কেননা তারা ঘুষ দুনীতি করতে পারবো না, যা ইচ্ছে তা করতে পারবে না, পর নারীর ইজ্জত লুট করলে তাদের জীবন থাকবে না, চুরি করলে তার হাত থাকবে না। এমন মদিনার ছায়া আমরা এ দেশে দেখতে চাই।
জামায়াতের আমির মব প্রসঙ্গে বলেন, দেশে মব কালচার নতুন না। ৭২ সাল থেকেই দেশে মব চলছে। ৭২ সালে মায়ের স্তন কেটে উল্লাস করেছে, এমন কুলাঙ্গার বাংলাদেশে আছে। সে নারী যেই হউক, সে আমার মা, সে নারী আমার বোন, আমার মেয়ে। তার স্তন কাটার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মানুষ মারা হয়েছে। সেগুলো কি মব ছিলো না সেগুলো মব ছিলো। মব কে সমর্থন করার সুযোগ নেই আমাদের। কোন নাগরিক নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার অধিকার নেই। দেশের সরকার ও বিচার বিভাগ বিচার করবে সেই আইন দেশের সংবিধানে রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আবু সাঈদ বিশাল আন্দোলনের আইকনিক পার্সন ছিলেন। তিনি রংপুরের গর্ব ২৪ জুলাইয়ে যারা নিহত হয়েছে, যারা আহত হয়েছে। আহতদের এখনও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এসবের সাথে যারা জড়িত ছিলো এদেশের মানুষে তাদের বিচার দেখতে চায়। তাদের বিচার হলে, তাহলে ভবিষৎতে কোন দলকে কেউ দুষ্ঠু করতে পারবে না। যদি বিচার না হয়, তাহলে ন্যায় বিচারের সংস্কৃতির অভাবে, বাংলাদেশ জঙ্গলে পরিণত হবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় যা দেখতে পাচ্ছি, বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশ্যে বলি, অতিতে যারা অপরাধ করেছেন, তাদের বিষয়টা রাষ্ট্র দেখবেন। এখন আপনারা যারা দায়িত্বে রয়েছেন, আপনারা দায়িত্ব পালন করুন। আপনারা ন্যায়ের পক্ষে থাকবেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন। জনগণ আপনাদের পাশে দাঁড়িয়ে আপনাদের শক্তি যোগাবে ইনশাআল্লাহ। আমরা আপনাদের পাশে থাকবো। কিন্তু অন্যায় দেখলে আমরা সবার আগে প্রতিবাদ করবো। অতএব অন্যায়কারীর পক্ষ নিবেন না। জনগণের বিপক্ষে যাবেন না। জনগণের বিপক্ষে গেলে কি পরিণতি হয় সেটা ২০২৪ সালে দেখেছেন।
রংপুরে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় দীর্ঘ ১৭ পর এর আগে সকাল থেকেই জনসভাস্থলে নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেন। দূর-দূরান্ত থেকে রিকশা, অটোরিকশা, ভ্যান, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে জনসভায় জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। মাঠেই দু'টি জামাতের মাধ্যমে জুমার নামাজ আদায় করেন।সমাবেশস্থল ছাড়াও ডিসির মোড়, কাচারি বাজার, আরডিআরএস মোড়সহ বিভিন্ন সড়কে নেতাকর্মীদের উপচে পরা উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। কখনও রোদ, কখনও ছায়া, এই রোদছায়ার লুকোচুরি আবহাওয়ার মাঝেই মাঠে বসেছেন হাজার হাজার নেতাকর্মী। বক্তব্যের শেষে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে সমাবেশস্থল। সেই সাথে দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লায় ছেয়ে যায় পুরো মাঠ।জনসভা থেকে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩ টি আসনে জামায়াতের প্রার্থীদেও সভা মঞ্চথেকে হাত তুলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।