বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩
☰ সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

রাজনীতির দৃশ্যপট


প্রকাশ : (৩ ঘন্টা আগে)
রাজনীতির দৃশ্যপট

ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র—ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম দেয়। সেই সাথে প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাধিক দেশীয় বা আধা-স্বাধীন করদ রাজ্য ছিল, যার মধ্যে কাশ্মীর ও মহীশূরের মতো অঞ্চলগুলো পরবর্তী সময়ে ভারতে অন্তর্ভুক্ত হয়। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল এবং তাদের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন উভয় ধর্মের শীর্ষ নেতারা। ব্রিটিশদের মধ্যস্থতায় নেতাদের পারস্পরিক সমঝোতা ও আলোচনার ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত দেশভাগ চূড়ান্ত রূপ নেয়। উত্তরসূরি হিসেবে আজ আমরা সেই সিদ্ধান্তকে ‘সঠিক’ বা ‘ভুল’ যাই বলি না কেন, তৎকালীন জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার শতভাগ অনুধাবন করা আমাদের পক্ষে সহজ নয়।
দেশভাগের পর থেকেই দুই দেশের শাসকদের মধ্যে আধিপত্য ও প্রতিযোগিতার এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াই শুরু হয়। উভয় দেশকে আবারও একত্রিত করার যে কোনো অলীক পরিকল্পনা আজ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও অবাস্তব। এ ধরনের চিন্তা কেবল পারস্পরিক বৈরিতা বৃদ্ধি, দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি বিনষ্ট এবং একে অপরের ক্ষতি করার ষড়যন্ত্রকেই উসকে দেয়। এই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলস্বরূপ উভয় দেশ বারবার যুদ্ধে জড়িয়েছে; যেখানে কখনো একপক্ষ জয়ী হয়েছে, তো কখনো অন্যপক্ষ। ১৯৪৭-এর দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় তৃতীয় রাষ্ট্র—বাংলাদেশ। ফলে এই অঞ্চলে দ্বিমুখী প্রতিযোগিতার জায়গায় শুরু হয় ত্রিমুখী রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, যাদের ষড়যন্ত্রে কাশ্মীর বিভক্ত হয়েছিল কিংবা পাকিস্তান ভেঙেছিল, তারা দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের তৈরি ফাঁদেই পড়েছে। তবে পাকিস্তানের ভাঙন ছিল একপ্রকার ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রায় এক হাজার মাইলের দূরত্বে থাকা দুটি ভিন্ন ভূখণ্ড কখনো সমান মর্যাদায় একটি অভিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে পারে না। বৈষম্য ও শোষণের শিকার হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় তাই সময়ের দাবি ছিল। এটি ১৯৭১ সালে না হলেও হয়তো ১৯৭২ কিংবা ১৯৯০ সালে হতো; যা অবশ্যম্ভাবী, তা ঘটতই।
এই ভাঙনের ফলে যারা সাময়িক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, দীর্ঘমেয়াদে তারা তৃতীয় আরেকটি প্রতিযোগী রাষ্ট্রের মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে সহযোগিতার নামে একটি বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ এ দেশের একটি রাজনৈতিক দলকে নিজেদের স্বার্থরক্ষাকারী শক্তি হিসেবে লালন করার চেষ্টা চালিয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। দলটির রাজনীতি দেশের অভ্যন্তরে হলেও তাদের পরিচালনায় প্রতিবেশী দেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব স্পষ্ট—যেমনটি ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে তৎকালীন ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ দেখা গিয়েছিল। নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখতে তারা বিপুল রাজনৈতিক বিনিয়োগ করেছে এবং এর বিনিময়ে অর্থনৈতিক সুবিধা, ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট করিডোর এবং একপাক্ষিক বাণিজ্যিক সুযোগ আদায় করে নিয়েছে।
অন্যদিকে, ৭১-এর পরাজিত পক্ষ পাকিস্তানও নিজেদের স্বার্থে তৎকালীন তাদের মিত্র কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে চায়। তবে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে তারা দলগতভাবে এখানে ভারতের মতো স্থায়ী ও শক্তিশালী কোনো অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। দুই দেশের এই সুবিধার পেছনে উদ্দেশ্যও ভিন্ন—ভারতের মূল লক্ষ্য কৌশলগত আধিপত্য ও অর্থনৈতিক সুবিধা হাসিল, আর পাকিস্তানের উদ্দেশ্য কেবল তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও ভারতীয় প্রভাবের ভারসাম্য বজায় রাখা।
রাজনীতির মূল দৃশ্যপট সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই থাকে; যা আমরা প্রকাশ্যে দেখি, তা অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে ভিন্ন হয়। দুই দেশ থেকে ভেঙে তিন দেশ হওয়া এই উপমহাদেশে আধিপত্যের রাজনীতি কখনোই থেমে থাকেনি। এর ফলে তৃতীয় দেশটিতে (বাংলাদেশ) উভয় পক্ষেরই কিছু সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তারা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরস্পরকে ক্রমাগত দোষারোপ ও কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত রাখে, আর সেই সুযোগে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
আমরা সাধারণ নাগরিকেরা প্রায়শই এই হিসাব-নিকাশের নীরব দর্শক হয়ে থাকি। তবে সব হতাশার মাঝেও এই আশাটুকু বেঁচে থাকে—সব ধরনের পরাশক্তির প্রভাব ও বশ্যতা এড়িয়ে কোনো একদিন বাংলাদেশ আত্মমর্যাদাশীল ও পরিপূর্ণ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
মুহাম্মদ ইয়ার আলী
     স্বত্বাধিকারী,
আলী ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবলস কোল্ড স্টোরেজ
কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট।

বিজ্ঞাপন