বাংলাদেশের কৃষি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর প্রশ্ন দিয়ে কৃষকের সংকট বোঝা যাবে না। কৃষকের জমি ছোট হচ্ছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, সার-বীজ-কীটনাশক ও জ্বালানির দাম বাড়ছে, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও তার মালিকানা অধিকাংশ কৃষকের হাতে নেই, ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হচ্ছে না এবং উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত কৃষক ক্রমেই এক বহুমাত্রিক বাজারনির্ভর ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। একদিকে কর্পোরেট কৃষি ও বৃহৎ ব্যবসায়িক পুঁজির প্রভাব বাড়ছে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক বিচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন ও বিক্রি করতে গিয়ে দরকষাকষির ক্ষমতা হারাচ্ছেন।
এই বাস্তবতায় কৃষকের সামনে মৌলিক প্রশ্ন হলো—কৃষক কি কেবল উৎপাদক হিসেবেই থাকবে, নাকি উৎপাদন, উপকরণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের মালিকানাতেও অংশ নেবে?
আমাদের বক্তব্য হলো, কৃষককে কেবল সরকারি ভর্তুকির গ্রহীতা কিংবা বাজারের দুর্বল ক্রেতা-বিক্রেতা হিসেবে রেখে কৃষির সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কৃষকের নিজস্ব অর্থনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। সেই সংগঠনের অন্যতম কার্যকর ভিত্তি হতে পারে আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও কৃষক-মালিকানাধীন বহুমুখী সমবায়।
এখানে সমবায় বলতে অতীতের আমলাতান্ত্রিক কিংবা কাগুজে সমিতিকে বোঝানো হচ্ছে না। আবার সমবায়কে কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনে পরিণত করার কথাও বলা হচ্ছে না। প্রয়োজন এমন একটি কৃষক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যার মালিক কৃষক, পরিচালনায় কৃষকের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে, পেশাদার ব্যবস্থাপনা থাকবে এবং যার প্রধান লক্ষ্য হবে সদস্য কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, ঝুঁকি কমানো এবং বাজারে দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
বাংলাদেশের কৃষক সংগঠনগুলোর জন্য এটি একটি নতুন চিন্তার ক্ষেত্র। দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত বহু কৃষক সংগঠন রয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে কৃষকের দাবি, সার, সেচ, বিদ্যুৎ, কৃষিঋণ, ফসলের দাম ও কৃষকের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেছে। কিন্তু কৃষক সংগঠনের একটি বড় অংশ এখনো মূল রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে কৃষকের অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে।
পরিবর্তিত বাস্তবতায় এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা জরুরি। কৃষকের রাজনৈতিক মত আলাদা হতে পারে, কিন্তু উৎপাদন খরচ কমানো, ভালো মানের সার ও বীজ পাওয়া, কৃষিযন্ত্র ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা, ফসল সংরক্ষণ, ন্যায্যমূল্যে বিক্রি এবং মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমানোর স্বার্থে কৃষকদের এক জায়গায় আসার সুযোগ রয়েছে। সেখানেই কৃষক সংগঠনগুলোর একটি অভিন্ন কর্মক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
সমবায়ের প্রথম কাজ হতে পারে উৎপাদনের উপকরণে কৃষকের সম্মিলিত শক্তি তৈরি করা। একজন কৃষক অল্প পরিমাণ সার বা বীজ কিনলে তাঁর দরকষাকষির ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু একটি ইউনিয়নের কয়েকশ কৃষক যদি আগাম নিজেদের প্রয়োজন নিরূপণ করে সমবায়ের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে সার, বীজ, জৈবসার, কৃষি উপকরণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করেন, তাহলে ক্রয়মূল্য কমানো এবং সরবরাহ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে কোন জমিতে কী ফসল, কত সার, কখন প্রয়োগ করতে হবে—সেই তথ্যও সমবায়ভিত্তিক কৃষিসেবা ব্যবস্থার অংশ হতে পারে।
বিশেষ করে সার ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন পদ্ধতি প্রয়োজন। সার বিতরণকে শুধু সরকারি ডিলারনির্ভর ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ না রেখে কৃষক সমবায়কে অনুমোদিত অংশীদার করা যেতে পারে। কৃষকের আগাম চাহিদা, জমির পরিমাণ, মাটির পরীক্ষা ও ফসলের ধরন অনুযায়ী মৌসুমভিত্তিক সার পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। কৃষকের নামে ডিজিটাল হিসাব থাকবে। এতে সরবরাহের স্বচ্ছতা বাড়বে, কৃত্রিম সংকট কমবে এবং অতিরিক্ত সার ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
কিন্তু সমবায়কে শুধু সার বিতরণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করলে চলবে না। এর লক্ষ্য হতে হবে ‘বীজ থেকে বাজার’ পর্যন্ত কৃষকের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা।
একটি আদর্শ বহুমুখী কৃষক সমবায়ের অন্তত কয়েকটি শাখা থাকতে পারে—উৎপাদন পরিকল্পনা, কৃষি উপকরণ সরবরাহ, মাটি পরীক্ষা ও কৃষি পরামর্শ, কৃষিযন্ত্র সেবা, সেচ ব্যবস্থাপনা, ফসল সংগ্রহ, গুদাম ও শীতল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, সম্মিলিত বিপণন, কৃষিঋণ ও সঞ্চয়, তথ্য ও ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন।
এতে কৃষক শুধু ধান, আলু, সবজি কিংবা ফল উৎপাদন করবেন না; উৎপাদনের পরবর্তী ধাপের একটি অংশের মালিকও হবেন। যেমন, কৃষকেরা সম্মিলিতভাবে আলু উৎপাদন করলে সমবায় আলু সংগ্রহ, বাছাই, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাত করতে পারে। সবজি উৎপাদন হলে স্থানীয়ভাবে বাছাই, প্যাকেটজাত ও সরাসরি শহরের বাজার, হোটেল, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতার কাছে সরবরাহ করা যেতে পারে। ধান হলে সমবায় ধান সংগ্রহ করে শুকানো, সংরক্ষণ, মজুত ও চাল প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
এর ফলে কৃষককে একই সঙ্গে উৎপাদক ও বাজারের অংশীদারে পরিণত করা সম্ভব।
এই ধারণার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীনে কৃষক সমবায় ও কৃষি উৎপাদন সংগঠনের নানা রূপ বিকশিত হয়েছে। চীনের বর্তমান কৃষি ব্যবস্থায় পরিবারভিত্তিক কৃষিকে ভিত্তি রেখে সমবায়, পরিবারভিত্তিক খামার এবং কৃষিসেবা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি বহুমাত্রিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ২১ লাখের বেশি কৃষক সমবায় এবং প্রায় ৪০ লাখ পারিবারিক খামার ছিল।
চীনের অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সমবায় মানেই ব্যক্তিগত কৃষি বিলুপ্ত করা নয়। ক্ষুদ্র কৃষকের পারিবারিক উৎপাদন বজায় রেখেও কৃষিযন্ত্র, প্রযুক্তি, বাজার, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিভিন্ন সেবাকে সমবায়ের মাধ্যমে সংগঠিত করা সম্ভব। ২০২৪ সালে চীনে গ্রামীণ সমষ্টিগত অর্থনৈতিক সংগঠন সম্পর্কেও পৃথক আইন প্রণীত হয়েছে, যা গ্রামীণ সমষ্টিগত সম্পদ ও অর্থনৈতিক সংগঠনের ব্যবস্থাপনার জন্য আইনি কাঠামো দিয়েছে।
ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা
লেখক : অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী,শফিয়ার রহমান, বখতিয়ার হোসেন শিশির।
চোরাচালন ব্যবসা ও সীমান্ত রাজনীতি
১ দিন আগে
হৃদয়ের মিনারে আজও যাঁর নাম ‘ওস্তাদজী’
৪ দিন আগে
ওয়াজ মাহফিল বিকল্প কর্মসংস্থান
৪ দিন আগে