শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

ওয়াজ মাহফিল বিকল্প কর্মসংস্থান


প্রকাশ : (৩ দিন আগে)
ওয়াজ মাহফিল বিকল্প কর্মসংস্থান

বাংলাদেশে সাধারণত হেমন্ত ও শীতকালে ওয়াজ মাহফিলের মৌসুম শুরু হয়ে যায়। এই মৌসুমকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের আলেম-ওলামারা সারাটি বছর অপেক্ষা করে কারণ মৌসুমী ওয়াজ নসিহত করে সংসার চালানোই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। মৌসুমে যারা ওয়াজ নসিহত করেন তাদের বেশিরভাগই কওমি ঘরানার মুফতি মুহাদ্দিস ডিগ্রি ধারি আর সামান্য সংখ্যক আলিয়া ঘরানার । যাদের ডিগ্রী কামিল বা ফাজিল। হাতে গোনা কয়েকজন মাদানী, মাক্কী বা আল আজাহারি রয়েছে । তবে বেশিরভাগ ওয়াজেনের পোস্টার ব‍্যানারে নিদ্রিষট কোন পেশার বিবরন পাওয়া যায় না শুধু খতিব,পেশ ইমাম,খাদেম  মাদ্রাসার শিক্ষক অথবা বিভিন্ন তাফসির কারক সমিতির সভাপতি সেক্রেটারির পথ ধারি অপেশাদার টাইটেল দেখা যায়।কোন কোন ক্ষেত্রে পীর সাহেবের সিলসিলার টাইটেল সম্পন কিছু পোস্টার দেখা যায়।বেশিরভাগ বক্তা ওয়াজ নসিহত প্রদান করে হাদিয়ার নামে সন্মানী ভাতা গ্রহণ করে সেই টাকায় গাড়ি বাড়ি সংসার চালানোর পরিকল্পনা করে থাকেন। সে কারণে ওয়াজ মাহফিল এখন একটি বিকল্প পেশা হিসাবে পরিচিত হচ্ছে।  কিভাবে এটি বিকল্প পেশা তার বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হল-

(১) প্রতি মৌসুমে ওয়াজ মাহফিলের সংখ্যা ও স্থান-বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ৪,৫৮৮টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে এবং প্রতিটিতে  ইউনিয়নে ৯টি করে ওয়ার্ড থাকায় মোট ওয়ার্ডের সংখ্যা ৪১,২৯২টি। প্রতিটি ওয়ার্ডে ২০ থেকে ৩০ টি করে পাড়া বা টারি রয়েছে। যদি প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে একটি করে ওয়াজ মাহফিল হয় তাহলেও বাৎসরিক ওয়াজ মাহফিলের সংখ্যা ৪১ হাজার ২৯২ টি ওয়াজ হবে। ওয়ার্ড ইউনিয়ন ছাড়াও থানা জেলা এবং কেন্দ্রীয়ভাবে আরো বহু ওয়াজ মাহফিল আয়োজিত হয়ে থাকে যাদের সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন।

(২) মাহফিলের আর্থিক বিবরণ-প্রতিটি ওয়াজ মাহফিল আয়োজনের জন্য আয়োজক কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে অবশ্যই ব্যয় করতে হয় যেমন প্রচারের জন্য পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট,মাইকিং,সাউন্ড বক্স ,স্টেজ,সামিয়ানা, লাইটিং,বক্তার সম্মানি ভাতা সাথে আপ্যায়ন এবং যাতায়াত খরচ। প্রত্যেকটা মাহফিলের জন্য যদি গড়ে দুই লক্ষ টাকা করে খরচ হয় তাহলে বাৎসরিক মোট খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮২৫,৮৪,০০০০০/ (আটশত পঁচিশ কোটি চৌরাশি লক্ষ টাকা) এ টাকার মধ্যে কমপক্ষে এক চতুর্থাংশ টাকা ওয়াজেনদের সনমানী ভাতা এবং আপ‍্যায়নে ব্যয় করা হয় (অর্থ‍্যাৎ প্রায় ২০০/-২২৫/ কোটি টাকা)। সামগ্রিকভাবে বাৎসরিক প্রায় ৮০০-১০০০ কোটি টাকার মতো  আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে। যাতে ওয়াজেন ছাড়াও সমাজে অনেক ধরনের পন্যের উপযোগিতা এবং চাহিদা সৃষ্টি হয়ে থাকে যাতে  ধর্ম প্রচারের নামে বহু সংখ্যক লোকের সংক্ষিপ্তকালীন বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়ে থাকে।

(৩) মাহফিলের টাকার উৎস-বাংলাদেশে ওয়াজ মাহফিল করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগানদাতা বা উৎস হল এদেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজন সাথে অন্যান্য সম্প্রদায়ের কিছু দানশীল ব্যক্তিও থাকে,তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শিল্পপতি,উদ্যোক্তারা বেশি অবদান রাখে। তবে  ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মেম্বার সংসদ সদস্য উপজেলা চেয়ারম্যান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সহ বিভিন্ন সেক্টরের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হাসিলের জন্য বেশি দান করে থাকে। অবশ্য তাদের এই দানকে দান হিসেবে বলা যায় না কারণ তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য একজনের অধিকার কর্তন করে আরেকজনকে দান করে বাহবা নেওয়ার চেষ্টার করে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একজনের আমানত বা রাষ্ট্রের আমানতের অর্থ সম্পদ চুরি করে অন্য জনকে দান করে দানশীলতার পরিচয় দিয়ে থাকে । অনেক সময় বাধ্য হয়েই তারা আমানত খেয়ানত করে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করে থাকে ।এতে সামাজিক দুর্নীতির স্থায়ী কাঠামো তৈরি হয়ে যায় । যদিও ধর্ম এ ধরনের কাজকে অবশ্যই কবিরা গুনাহ হিসেবে দেখে।

(৪) সামগ্রীক ফলাফল-ওয়াজ মাহফিল গুলোতে সংশ্লিষ্ট এলাকার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সাধারণত সভাপতি করা হয় কিন্তু তারা বেশিরভাগ সময় উপস্থিত হয় না অথবা থাকেনা। তাদের মিথ্যা বয়ান ও প্রশংসা করে ধর্মের নামে মাহফিল গুলো পরিচালনা করা হয়ে থাকে। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য রাজনৈতিক দল বা দলের নেতাদেরকে মাহফিলের সভাপতি করে সভার ধর্মীয় গুরুত্ব ম্লান করে দেওয়া হয়। ওয়াদা ভঙ্গ কারী মিথ্যাবাদী ধর্ম বিদ্বেষী কিংবা ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে অনীহা লোকজনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করার কারণে এ ধরণের মাহফিলের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে এবং ধর্মীয় অনুভূতি সৃষ্টি না করে বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে বলে মনে হয়। এক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে যে মাহফিল গুলো এখন রাজনৈতিক দল এবং স্থানীয় নেতাদের রাজনৈতিক মঞ্চের  বিকল্প সৃষ্টি করেছে।

(৫) মাহফিলের মাধ্যমে সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি-বিকল্প কর্মসংস্থানে হিসেবে সরাসরি যে সমস্ত সেক্টরে ওয়াজ মাহফিল প্রভাব বিস্তার করে তার মধ্যে অন্যতম হলো-

ক) ওয়াজ মাহফিল পেশাহীন মাওলানাদের মৌসুমি পেশা সৃষ্টি করে বাৎসরিক আয়ের পথ প্রশস্ত করে।

খ) সমাজের বেকার যুবক যুবতীদের আনন্দ ফুর্তি সৃষ্টি করে তাদেরকে সবতপ্রণোদিত ভাবে সামাজিক কাজে সম্পৃক্ত করে। এতে তারা সাময়িক বিনোদন মুলক কাজে নিয়োজিত হয়ে আনন্দ পায়।

গ) ডেকোরেটর ব‍্যবসায়ী সমূহের জমজমাট ব্যবসা -মাইক ভাড়া দিয়ে,লাইটিং করে,সামিয়ানা ভাড়া দিয়ে,স্টেজ সাজিয়ে কিংবা সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করে আয় করে থাকে।

ঘ) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-মাওলানাদের ওয়াজ বা বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ফেসবুক ইউটিউব সহ সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশাল অংকের ব্যবসা করে থাকে।

ঙ) মেলা সৃষ্টি -ওয়াজ মাহফিল গুলোর চতুর্দিকে সাময়িকভাবে খাবারের দোকানপাট কিংবা খেলনা জাতীয় আইটেমের বেচাকেনা জমে ওঠে। এতে সাময়িক একটি ব্যবসায়িক সুবিধার সৃষ্টি হয়।

সার্বিকভাবে ওয়াজ মাহফিল গুলো সমাজের নানান সেক্টরে অবদান রাখলেও প্রকৃতপক্ষে ইসলামের কতটুকু উপকার করে এ বিষয়ে ভাবার জন্য কিছু আলোচনা করা হল-
(১) সরাসরি কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা না করে নানা রকম কেচ্ছা কাহিনী গল্প গুজব বদনাম ,সমালোচনা,আলোচনার মাধ্যমে সমাজের মানুষকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত কর ঘৃনা বা হিংসুক করার চেষ্টা হচ্ছে কি না তা ভাবা উচিত।

(২) ধর্মীয় আলোচনা যদিও জোড় করে মানুষকে শোনানোর কোন নীতি বা নিয়ম ইসলামে নেই তারপরেও সম্মেলন অথবা ওয়াজ মাহফিলের চতুর্দিকে বড় বড় মাইক লাগিয়ে ধর্মীয় আলোচনা সমূহ উচ্চ শব্দে মানুষের কর্ন কুহরে জোড় করে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টাকে ধর্মের পক্ষে না  বিপক্ষে যায় তা ভাবা উচিত।

(৩) ওয়াজ মাহফিলে বসে ধর্মীয় বক্তারা একে অপরকে গালিগালাজ কাফের মুনাফিক নানা রকম উস্কানিমূলক ফতোয়া বা বক্তব্য দিয়ে সাধারণ লোকদের মধ্যে ধর্ম সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে প্রকৃত ধর্ম থেকে মানুষকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে কিনা তাও ভাবা উচিত।

(৪) ওয়াজ মাহফিলে বক্তাদের গায়ে রংবেরঙের বাহারি পোশাক আর বাহারি টুপি মানুষকে ধর্মের দিকে আকর্ষণ করার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ধর্ম প্রচারের নামে টাকা রোজগারের পথ সৃষ্টির এ মাধ্যম বা প্রক্রিয়া ধর্ম প্রচারে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করছে তা ভাবা উচিত।

(৫) ধর্মীয় অনুভূতি ব‍্যবহার-সাধারণ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে চাদা সংগ্রহ করে উচ্চ হারে মাওলানাদের সম্মানী ভাতা আর পিকনিক খাওয়ার কাজে ব্যয় করাটা কতটুকু সুসঙ্গত তা ভাবা উচিত।

(৬) প্রতারনা -একজন মাওলানা এক ঘণ্টা বা দুই ঘন্টা ধর্মীয় বয়ানের জন্য যে সময়টুকু আল্লাহর ওয়াস্তে ব্যয় করার কথা তার বিনিময়ে তারা উচ্চ হারে সম্মানী ভাতা বা বিনিময় গ্রহণ করে মানুষকে প্রতারিত করছে কি না তাও ভাবা উচিত।

(৭) বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বানিজ্যক ভাবে ধর্ম প্রচার করে ছওয়াবের প্রত্যাশা কতটুকু যুক্তিসম্মত সেটাও ভাবা করা উচিত এবং এর ব্যাখ্যা থাকা উচিত।

(৮) রাজনৈতিক প্রচারণায় কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করা -রাজনৈতিক মাহফিলে চাঁদা দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের আমানতকারী থেকে খেয়ানতকারীতে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া এবং তাদেরকে সভাপতি করে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া কতটুকু ধর্মীয় নিয়ম নীতির মধ্যে পড়ে তাও ভাবা উচিত
(৯) শব্দ দূষণ মাহফিলের মাইক বা সাউন্ডবক্সে অতি উচ্চস্বরে শব্দধনী সৃষ্টি করে আশেপাশে এলাকার অসুস্থ মানুষের শান্তিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা কতটুকু যুক্তি সম্মত ভাবা উচিত।

ওয়াজ মাহফিলের এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সাধারণভাবে কয়েকটি বিষয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে । সে ক্ষেত্রে সকল বিবেকবান মানুষের কাছে এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে মৌসম শুরুর আগেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত বলে মনে হয়।
(১) ওয়াজ মাহফিল  গুলোকে  মানুষের বিরক্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নির্দিষ্ট এলাকায় সাউন্ড বক্স লাগিয়ে নির্দিষ্ট শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখে আলোচনা বা বক্তব্য রাখা উচিত।
(২) মাওলানাদেরকে বাহারি পোশাকে নয়  বাহুল্য কথায় নয় শুধুমাত্র মানুষের নিদ্রিষট সমস্যা কোরআন বা হাদিস দ্বারা সমাধানের পথ আলোচনা করা বা তাফসীর পেশ করা উচিত যাতে মানুষের ধারণার মধ্যে বিষয়টি বোধগম্য হয়ে যায়।
(৩) বক্তা বা মাওলানাদের জ্ঞান বা শিক্ষাগত যোগ্যতা অথবা ডিগ্রির উপর ভিত্তি করে ঘন্টা প্রতি সম্মানী ভাতা ও যাতায়াত ভাতা নির্ধারণ করে দেয়া উচিত এই সংখ্যা বা পরিমাণ কখনোই অনির্দিষ্ট হতে পারে না।
(৪) কোন বক্তা কোন বিষয়ে আলোচনা করবে সেই বিষয়টি পোস্টার ব্যানার বা মাইকে আগেই প্রচার করে দেয়া উচিত এবং মঞ্চে সেই বক্তাকে সেই আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।এলোপাতাড়ি আলোচনা করে সময় নষ্ট করে দেওয়া মোটেও ঠিক নয়।
(৫) মাহফিলের খরচে রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে দান বা চাঁদা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত কারণ তারা বেশিরভাগ সময়েই সৎপথের আয় থেকে ব্যয় করে না এবং এর মাধ্যমে ধর্ম প্রচারের কোন সফলতা পাওয়া যায় না।

(৬) মাহফিলের সভাপতিত্ব করার জন্য যারা উপযুক্ত এবং সময় দিতে পারবে তাদেরকেই সভাপতি করা উচিত। সমাজের কোন মিথ্যুক চাঁদাবাজ কিংবা উপস্থিত থাকতে পারবে না জেনেও সভাপতি হিসেবে নাম দেওয়া মোটেই সঠিক হয় না।

ধর্মীয় প্রচারনায় যারা জড়িত তাদের উদ্দেশ্যে  এ পরামর্শ সম্ভব হলে বিবেকের সাথে কথা বলার আহ্বান জানাচ্ছি। ধন্যবাদ

লেখক: মুহাম্মদ ইয়ার আলী

বিজ্ঞাপন