শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

চোরাচালন ব‍্যবসা ও সীমান্ত রাজনীতি 


প্রকাশ : (১৬ ঘন্টা আগে)
চোরাচালন ব‍্যবসা ও সীমান্ত রাজনীতি 

বাংলাদেশের চোরাচালান ব্যবসার পন্য দ্রব্য সমুহ কোনটাই বাংলাদেশে উৎপাদন তৈরী কিংবা প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয় না,সবটাই রেডিমেড অবস্থায় সীমান্ত পথে আমদানি করা হয় । অদ্যবধি পর্যন্ত বাংলাদেশের চোরাচালান ব্যবসার পথ হিসেবে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমারকে দেখা গেছে। অন্য কোন দেশ থেকে সরাসরি কোন মাদকদ্রব্য বা চোরাচালান পণ্য আসে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যখন যে দল ক্ষমতাসীন থাকে তখন সবাই প্রচার মাধ্যমে প্রচার করার চেষ্টা করে যে তারা সীমান্ত চোরাচালান ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করছে কিন্তু ঘটনা আসলে তা নয় । ঘটনার অভ্যন্তরে আরো কিছু ঘটনা রয়েছে সে বিষয়ে কিছু আলোচনার জন্যই আজকের এই প্রেক্ষাপট-দেশের যুবসমাজের চরিত্র ধ্বংস এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্য সীমন্ত অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । কারণ সীমান্তে বসবাসকারী ব্যক্তিদের সীমান্তের উভয় পারে জমিজমা বাড়ীঘর আত্বীয় স্বজন থাকায় তারা রাষ্ট্রীয় সীমানার কোন বেড়িয়ার মানতে চায় না আর না মানার এ কাহিনী-ই হলো সীমান্ত পাচার বানিজ্য। মাদক চোরাচালান এ বানিজ্যের একটি অংশ মাত্র। সীমান্তে কিভাবে ,কারা চোরাচালান বানিজ্যে  নিয়োজিত থাকে এবং কিভাবে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো-

(১) বাংলাদেশের  সাথে ভারত বা মায়ানমার সীমান্তের উভয় পারে বসবাসরত ব্যক্তিদের বেশিরভাগ লোকেই আন্তর্জাতিক চোরাচালান বাণিজ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। অর্থাৎ কেউ সরাসরি বাণিজ্য করে,কেউ বাণিজ্যর লোককে শেল্টার হিসেবে জায়গা প্রদান করে ,কেউ সব দেখে কিন্তু প্রশাসনের কাছে বলবে না মর্মে কমিশন নেয়,কেউ সাংবাদিকদের ম্যানেজ করে , কেউ রাজনৈতিক নেতা ম‍্যানেজ করে ,কেউ প্রশাসন ম্যানেজ করে, কেউ রাস্তা ক্লিলিয়ার করে এভাবেই কয়েকটি গ্রুপ মিলে সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে এ ব্যবসা করে থাকে। সীমান্তের লোকদের আয়ের একটি বড় অংশ চোরাচালান বাণিজ্য থেকে আসে। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত লোকজনের কথা এবং কাজে কখনই বিশ্বাস রাখা ঠিক নয়।

(২) সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন বলতে সাধারণত ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য, চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ সদস্যকে বুঝিয়ে থাকে কিন্তু এই সমস্ত এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণের দুই একজন ছাড়া সকলেই চোরাচালান ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে। যেমন আঙ্গুরপোতা দহগ্রাম এলাকা দিয়ে একজোড়া গরু পাচার করতে চাইলে স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বারকে দশ হাজার টাকা থেকে বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদা নির্ধারিত নিয়মে পরিশোধ করতে হয়।নইলে গরু বিক্রি করার জন্য চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেট পাওয়া যায় না। তেমনি যে রাখাল দিয়ে গরু বা  অন্য কোন পণ্য আনা নেওয়া করা হয়। (যারা চোরাচালান কাজে ব্যবহৃত হয় তাদেরকে  রাখাল বলা হয় )। রাখালকে একজোড়া গরু পাচার করার জন্য  ১০,০০০ থেকে ১৫০০০/ টাকা দিতে হয় । গরু ছাড়া অন্য কোন পণ্য আনা নেওয়া করার জন‍্য ও  পুর্ব নির্ধারিত হারে চাঁদা প্রদান করতে হয়।বেশিরভাগ সময় দিনের বেলা তারা কাজকাম ছাড়া ঘোরাঘুরি করে রাত হলে বানিজ্যের কাজে জড়িয়ে পরে।

(৩) চোরাচালান ব্যবসা বা মাদক ব্যবসা করার জন্য সীমান্ত এলাকায় সাধারণত কয়েকটি সময়কে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। তার মধ্যে শীতকালে কঠিন কুয়াশার সময় । কুয়াশায় যখন কিছু দেখা দেখা যায় না সে সময় প্রচুর পরিমাণে চোরা চালান বা মাদক পাচার হয়ে থাকে । ঠিক তেমনি যখন প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়  মানুষ বের হতে পারে না,তখন পাচার সংঘটিত হয় আবার অমাবস্যার রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকারে জমে ওঠে।

(৪) সীমান্তরক্ষী বাহিনী কখনো কখনো বিভিন্ন চৌকিতে কড়াকরি আরোপ জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ঠিক তার মাঝখানে  যে কোন একটি সীমান্ত চৌকি উন্মুক্ত করে দেয় । সীমান্তের কড়াকরি অবস্থাটাকে পত্রপত্রিকার মাধ্যমে প্রচার করতে থাকে এর ফাঁকে যে কোন একটা চৌকি কয়েক ঘন্টা বা কয়েকদিনের জন্য চুক্তি ভিত্তিতে ফাঁকা করে মাদক সহ যে কোন পণ্য চোরাচালানে সহোযোগিতে করে থাকে। এর জন্য স্থানীয় জন প্রতিনিধি ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সরাসরি জড়িত থাকে।

(৫) সীমান্ত এলাকার নির্বাচিত জন প্রতিনিধি হিসেবে চেয়ারম্যান মেম্বার ছাড়াও এমপি সাহেবরা চোরা চালান বা মাদক বাণিজ্যে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে। যখন দেখা যাবে যে তারা মাদকের বিরুদ্ধে ব‍্যাপক প্রচার-প্রচারণা  চালাচ্ছে ঠিক তখনই তাদের ভিতরে ঢুকে যদি ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে যে তারা সীমান্ত চৌকি ফাঁকা নীতিতে জনগনকে ধোঁকা দিচ্ছে। কারণ সীমান্ত এলাকায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে পার্শ্ববর্তী দেশ ,তাদের এদেশীয় এজেন্ট এবং তার সঙ্গে চোরাচালানকারীদের ব্যাপক যোগাযোগ থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চোরাচালান কারীদের নিকট হতে আগাম দাদন নিয়ে নির্বাচনের খরচ মেটানো হয়।ফলে নির্বাচনে জয়লাভের পর তাদের এড়িয়ে যাওয়া মোটেই সম্ভব হয় না। জন প্রতিনিধিরা শুধু রাস্তাকে নিরাপদ করার জন্য প্রশাসনকে ব্যবহার করে থাকে । তারা কখনো সরাসরি জড়িত হয় না।যেমন সীমান্ত থেকে দশটি সংযোগ সড়ক থাকলে তার মধ্যে আটটিকে কড়াকরি করার ব্যবস্থা করে একটি বা দুটি  রাস্তাকে নিরাপদ করে দিয়ে চোরাচালানের পন‍্য পাচার করতে সহযোগিতা করে থাকে। বিনিময়ে তারা  মাসিক হিসাবে বা বাৎসরিক হিসাবে চাঁদা পেয়ে থাকে। রাস্তার নিরাপত্তার কাজে তারা পার্টির বেকার ছেলেপেলেদেরকে ব্যবহার করে থাকে এর বিনিময়ে তাদেরকেও মাসিক এবং বাৎসরিকভাবে আর্থিক সহযোগিতা করে থাকে।

(৬) সীমান্তের চোরাচালান কারবারে জড়িত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান অথবা সংশ্লিষ্ট পদধারী ব্যক্তিদেরকে প্রশাসন চিনে বা জানে(  এখানে প্রশাসন বলতে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ ফাঁড়ি থানা ডিবি সহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার  লোকজনকে বোঝানো হয়) কিন্তু তাদেরকে প্রশাসন চালাতে গিয়ে যেহেতু অদৃশ্য খাতে ব্যয় করতে হয় ,সেই  ব‍্যয় মেটানোর তাগিদে  তারাও  চোরাচালান কারীদের নিকট  থেকে মাসিক বা বাৎসরিক হারে চাঁদা নিয়ে অদৃশ্য খাতের ব‍্যয় নির্বাহ করে থাকে।

(৭) চোরাকারবারীদের মাধ্যমে যেহেতু মানিলন্ডিং করা সহজ।  তাই সীমান্ত এলাকার জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের লোকদের সহযোগিতায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পার্শ্ববর্তী দেশে অবৈধ অর্থ পাচার করে থাকে। যাহা চোরাচালান পন্যের মুল্য হিসাবে লেনদেন করা হয়।

(৮) সীমান্তবর্তী এলাকার উভয় পাশেই উভয় দেশের মোবাইলের নেটওয়ার্ক  চালু থাকে বিধায় সীমান্তবর্তী এলাকার লোকজনের হাতে উভয় দেশের মোবাইলের সিম পাওয়া যায় এবং এক দেশ থেকে আরেক দেশে মোবাইলে কথা বলা যায়, এমনকি ফ্লেক্সিলোড দেওয়াও যায় বিধায় তারা একই দেশের মোবাইল ব্যবহার করে সীমান্তে পাচারের কাজে নিয়োজিত থাকে।

বাংলাদেশে চোরাচালান ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সীমান্ত এলাকায় অবশ‍্যই জনপ্রতিনিধিদেরকে জবাবদিহিতামূলক সৎ এবং বিবেকবান মানুষ হিসেবে নির্বাচিত করতে হবে। যতদিন সীমান্ত এলাকায় পার্শ্ববর্তী দেশের প্রতি ভক্ত লোক জনপ্রতি‍নিধি হিসাবে নির্বাচিত হবেন ততদিন কোন ভাবেই সীমান্ত চোরাচালান বানিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
লেখক: মুহাম্মদ ইয়ার আলী।

বিজ্ঞাপন