তিস্তা নদীর ভাঙন রোধে নির্মাণাধীন একটি বাঁধকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। যে নদীর ভাঙন ঠেকাতে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই নদীর বুক খনন করেই উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। পরে সেই বালু জিওটেক্স বস্তায় ভরে ব্যবহার করা হচ্ছে বাঁধ নির্মাণে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে একদিকে যেমন সরকারি প্রকল্পের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে আসন্ন বর্ষা ও পাহাড়ি ঢলে বাঁধটি টেকসই না হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার পাটিকাপাড়া ইউনিয়নের কারবেলার দিঘির পশ্চিমে উত্তর পারুলিয়া গ্রামে তিস্তা নদীর তীরবর্তী এলাকায় এ বাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণকাজ চললেও তদারকির দায়িত্বে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো কর্মকর্তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উত্তর পারুলিয়া গ্রামের মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী প্রতিবছরই দুই তীরে ব্যাপক ভাঙন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসের ভয়াবহ বন্যার পর ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। এতে বসতবাড়ি, কৃষিজমি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়ে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ২০০ মিটার দীর্ঘ একটি প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পে গাছের খুঁটি, কাঠ এবং বালুভর্তি জিওটেক্স বস্তা ব্যবহারের কথা রয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোট ৫ হাজার ৪০০টি জিওটেক্স বস্তায় প্রতিটিতে ১৭৫ কেজি করে বালু ভরাট করার কথা। তবে বাইরে থেকে বালু সংগ্রহের পরিবর্তে বাঁধের পাদদেশ সংলগ্ন নদী খনন করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, বোমা মেশিন ব্যবহার করে উত্তোলিত বালুই সরাসরি জিওটেক্স ব্যাগে ভরা হচ্ছে। এতে নির্মাণ ব্যয় কমলেও বাঁধের নিচে গভীর গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বাঁধের স্থায়িত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, পাহাড়ি ঢল বা অতিবৃষ্টির সময় তিস্তার স্রোত বেড়ে গেলে নদীর তলদেশে সৃষ্ট এসব গর্তের কারণে বাঁধ ধসে পড়তে পারে। এতে সরকারের কোটি টাকার প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নতুন করে ঝুঁকিতে পড়বে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মোজাহারুল ইসলাম নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “লেভেলিং ও ড্রেসিং কাজের জন্য নদী থেকে বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনিল চৌধুরীর নির্দেশেই আমরা এ কাজ করছি।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড, লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনিল চৌধুরী। তিনি বলেন, “নদী খনন করে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এ বিষয়ে হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপ জন মিত্র বলেন, “সেতু, বাঁধ, বসতভিটা বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, তিস্তার ভাঙন রোধে গৃহীত প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করতে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে তদারকি করে টেকসই বাঁধ নির্মাণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
আদিতমারীতে খাল খননে বদলে যাচ্ছে জীবন মান
১ মাস আগে