২০১৯ সালের ২০ ডিসেম্বর একটি আন্তর্জাতিক কর্মশালায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে আমি নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম শহরে যাত্রা করি। এটি ছিল আমার জীবনে প্রথম কোনো ইউরোপীয় দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, যা নতুন পরিবেশ ও উন্নত সেবাব্যবস্থার সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সুযোগ করে দেয়।
আমস্টারডামে পৌঁছে বিকেলে হোটেলে চেক-ইন করার পর রুমে গিয়ে লক্ষ্য করি যে, সেখানে খাবার পানির কোনো বোতল সরবরাহ করা হয়নি। একটি পানির পাত্র থাকলেও সেটি খালি ছিল। বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় আমি রিসেপশনে যোগাযোগ করে পানীয় জলের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানাই। উত্তরে আমাকে জানানো হয় যে, বাথরুমের বেসিনের কলের পানি সরাসরি পানযোগ্য।
প্রথমে বিষয়টি আমার কাছে বিস্ময়কর এবং কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হয়। ফলে আমি পুনরায় বোতলজাত পানির জন্য অনুরোধ করি। পরবর্তীতে আমার সংশয় দূর করতে হোটেল কর্তৃপক্ষের একজন কর্মী রুমে এসে বাথরুমের কল দেখিয়ে ব্যাখ্যা করেন যে, সরবরাহকৃত পানি সম্পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ, মানসম্মত এবং নিরাপদ, যা সরাসরি পান করা যায়। এ অভিজ্ঞতা একটি উন্নত পানি সরবরাহ ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের দেশে ওয়াসা কর্তৃক সরবরাহকৃত পানির মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ বিদ্যমান। যদিও বিপুল অর্থ ব্যয়ে এই পানি সরবরাহ করা হয়, তবুও তা সরাসরি পানযোগ্য হিসেবে গণ্য করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াকরণ বা পরিশোধনের প্রয়োজন হয়।
অপরদিকে, নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও পর্যাপ্ত নিরাপদ পানীয় জলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। গ্রামীণ অঞ্চলে টিউবওয়েলের পানি বহুল ব্যবহৃত হলেও, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সরাসরি পান করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
উপরোক্ত অভিজ্ঞতা ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা একটি দেশের জনস্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সুশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
ওয়াসা কর্তৃক সরবরাহকৃত পানির নিম্নমানের কারণে দেশে নিরাপদ পানীয় জলের বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে পানি পরিশোধন যন্ত্র (ফিল্টার) এবং বোতলজাত পানির বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। এই খাতে বৈধ ব্যবসার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ বাণিজ্যও গড়ে উঠেছে, যার আর্থিক পরিমাণ শত শত কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নগরবাসী বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ব্যয় করে এসব বিকল্প উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করছে। ফলে নিরাপদ পানির প্রাপ্তি একটি মৌলিক সেবা হওয়া সত্ত্বেও, তা অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০০০ সালের শুরুর দিকে ইতালি থেকে আগত দুইজন পর্যটক সাভার ও সিঙ্গাইর অঞ্চলের কিছু গ্রামের বিদ্যালয় পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আসেন। তারা যে গেস্ট হাউসে অবস্থান করছিলেন, তার পাশের কক্ষেই আমার থাকার সুযোগ হয়েছিল। একদিন বিকেলে তাদের সাথে আলাপচারিতার সময় তারা আমাদের দেশে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তাদের প্রশ্নের উত্তরে আমি জানাই যে, সে সময়ে আমরা প্রধানত গভীর নলকূপের পানি পান করতাম, যা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে বিবেচিত হতো। অন্যদিকে, গোসল, বাসন ধোয়া, রান্নাসহ অন্যান্য কাজে আমরা ওয়াসা সরবরাহকৃত বা আয়রনযুক্ত পানি ব্যবহার করতাম। বিষয়টি শুনে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন, যদি গোসলের পানি সম্পূর্ণ নিরাপদ না হয়, তাহলে সেই পানি অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে; এর প্রতিকার কী?
প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হলেও, সে সময় এর কোনো সন্তোষজনক উত্তর আমার জানা ছিল না, এমনকি আজও বিষয়টি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। তাদের এই গভীর স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং পূর্বপ্রস্তুতি আমাকে বিস্মিত করেছিল। তারা বাংলাদেশে আগমনের পূর্বেই দেশের পানি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, যা তাদের প্রশ্নের গভীরতা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়েছে। এসব দেশে সাধারণ নাগরিকদের বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করা হয়। সেখানে অর্থের বিনিময়ে অনিরাপদ পানি সরবরাহের ঘটনা পুরোপুরি অনুপস্থিত। কারণ, পানি সরবরাহে কোনো ধরনের অবহেলা বা ত্রুটির ফলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়।
এর বিপরীতে, আমাদের দেশে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন বিদ্যমান। সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তাই বিদেশ ভ্রমণ করেছেন এবং উন্নত দেশের কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছেন; এমনকি তাদের কেউ কেউ দ্বৈত নাগরিকত্বও ধারণ করেন। তবুও দেশে মানসম্মত ও নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠে, যার ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় বা আত্মসাৎ হচ্ছে বলে জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে একটি বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে, একদিকে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে সক্ষম হলেও, অন্যদিকে দেশের বিপুলসংখ্যক নিম্নআয়ের মানুষ এখনও নিরাপদ পানীয় জলের জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে। এটি কেবল একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, বরং সামাজিক ন্যায্যতা ও জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার সাথেও গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট।
উল্লেখযোগ্য যে, সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলো আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আমাদের কঠিন বাস্তবতা সম্পর্কে ভালভাবে অবগত খাকলেও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন বা কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। বিগত চার দশকে সামান্য বিশুদ্ধ পানির দাবিতে কথা বলার অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। এমনকি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানের কাছে নিম্ন-আয়ের প্রায় দশ হাজার মানুষের প্রেরিত আবেদন ভ্রুক্ষেপ না করার অভিজ্ঞাও হয়েছে।
ফলে প্রশ্ন থেকে যায়; বর্তমান সরকার, যারা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা সম্পর্কে যথেষ্ঠ অবগত, তারা কি সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে?।
(লেখক:-একজন নদী গবেষক ও পানি বিশেষজ্ঞ)