কোনো জনপদের পরিচয় শুধু তার বর্তমান প্রশাসনিক সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তার পরিচয় নির্মিত হয় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ভূগোলের সম্মিলনে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটও তেমনই একটি জনপদ। আজকের এই জেলা একসময় ছিল কোচবিহার রাজ্যের অংশ, পরে মুঘল সাম্রাজ্যের সীমান্ত প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ভারতের রংপুর জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। তাই লালমনিরহাটের ইতিহাস মূলত ক্ষমতার পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; এটি উত্তরবঙ্গের রাষ্ট্রগঠন, সীমান্তনীতি এবং সামাজিক রূপান্তরের দীর্ঘ অভিযাত্রার ইতিহাস।
ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে মহারাজা বিশ্বসিংহের হাত ধরে কোচ রাজ্যের উত্থান ঘটে। তাঁর উত্তরসূরি মহারাজা নরনারায়ণের সময় (১৫৪০–১৫৮৭) কোচবিহার উত্তর-পূর্ব ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত হয়। তৎকালীন রাজ্যের বিস্তৃতি বর্তমান বাংলাদেশের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুরের উত্তরাংশ, ভারতের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি এবং পশ্চিম আসামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। আজকের কালীগঞ্জ, কাকিনা, হাতীবান্ধা, আদিতমারী, পাটগ্রাম কিংবা লালমনিরহাট সদর—সবই ছিল সেই বৃহত্তর কোচ রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ভূখণ্ড।
কোচবিহার ছিল কেবল একটি রাজ্য নয়; এটি ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক ভারসাম্যের অন্যতম কেন্দ্র। নরনারায়ণ ও তাঁর সেনাপতি চিলারায় সামরিক দক্ষতা, প্রশাসনিক প্রজ্ঞা এবং কূটনৈতিক বিচক্ষণতার মাধ্যমে রাজ্যটিকে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। উত্তরবঙ্গের বহু জনপদের মতো লালমনিরহাটও সেই রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ধারার অংশ হয়ে ওঠে।
কিন্তু ইতিহাসে কোনো শক্তির আধিপত্য চিরস্থায়ী হয় না। সপ্তদশ শতকের শুরুতে মুঘল সাম্রাজ্য উত্তরবঙ্গে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। ১৬১২ সালে মহারাজা লক্ষ্মীনারায়ণ সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সন্ধি করেন। এর ফলে কোচবিহার স্বাধীন সত্তা বজায় রাখলেও মুঘল সম্রাটের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব স্বীকার করে একটি করদ রাজ্যে পরিণত হয়। অর্থাৎ রাজারা তাঁদের সিংহাসন, রাজপরিবার ও অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ধরে রাখেন, কিন্তু সাম্রাজ্যিক ক্ষমতার বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হন।
এই সময় থেকেই বর্তমান লালমনিরহাট অঞ্চল কার্যত দুটি রাজনৈতিক শক্তির সংযোগস্থলে পরিণত হয়। কোচবিহার ও মুঘল—উভয় শক্তির প্রভাব এখানে সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে লালমনিরহাটের ইতিহাসকে কেবল কোচবিহার বা কেবল মুঘল ইতিহাস হিসেবে দেখলে বাস্তবতা সম্পূর্ণভাবে ধরা পড়ে না।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৬৮৭ সাল। কোচবিহারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভুটানি প্রভাব এবং সীমান্ত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ঘোড়াঘাটের মুঘল ফৌজদার এবাদত খান দক্ষিণ কোচবিহারে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, এই অভিযানের ফলে কাকিনা, কারজিহাট, ফতেপুরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরগনায় মুঘল প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান লালমনিরহাটের ইতিহাসে এই ঘটনাকে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলা যায়। কারণ এর পর থেকেই অঞ্চলটি ক্রমশ মুঘল প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে।
মুঘল শাসনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল জমিদারি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারগুলোকে জমিদারি প্রদান করা হয়। কাকিনা জমিদারির উত্থানও এই ধারার ফল। পরবর্তী সময়ে তাঁদের ‘রাজা’ উপাধিতে সম্বোধন করা হলেও তাঁরা কোচবিহারের মহারাজার মতো স্বাধীন সার্বভৌম শাসক ছিলেন না; বরং মুঘল এবং পরে ব্রিটিশ সরকারের স্বীকৃত বৃহৎ জমিদার ছিলেন।
১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের ইতিহাসে আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। লালমনিরহাট অঞ্চল রংপুর জেলার প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারি ব্যবস্থাকে স্থায়ী আইনি ভিত্তি দেয়। ব্রিটিশরা রাজস্ব আদায়, সড়ক, রেলপথ ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক ভূগোল পরিবর্তন করে।
উনিশ শতকের শেষভাগে রেলপথ নির্মাণ লালমনিরহাটকে নতুন গুরুত্ব এনে দেয়। লালমনিরহাট রেলওয়ে জংশন উত্তরবঙ্গ, কোচবিহার, দার্জিলিং ও আসামের মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তিস্তা নদীর পরিবর্তিত গতিপথ, সীমান্তবাণিজ্য এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি মিলিয়ে লালমনিরহাট উত্তরবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ এই অঞ্চলের ইতিহাসে আরেকটি যুগান্তকারী ঘটনা। দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক যোগাযোগ এক রাজনৈতিক সীমারেখায় বিভক্ত হয়ে যায়। কোচবিহার ভারতের অংশ হয়, আর লালমনিরহাট পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। বহু পরিবারের আত্মীয়তা, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক সীমান্তের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরও লালমনিরহাট রংপুর জেলার মহকুমা হিসেবেই ছিল। অবশেষে ১৯৮৪ সালে এটি একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজকের লালমনিরহাটের দিকে তাকালে আমরা একটি সীমান্ত জেলা দেখি। কিন্তু এর মাটির নিচে লুকিয়ে আছে কোচবিহারের রাজকীয় ঐতিহ্য, মুঘল সীমান্ত প্রশাসনের স্মৃতি, কাকিনা জমিদারির উত্তরাধিকার, ব্রিটিশ রেলওয়ে নগরায়ণের ইতিহাস এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিকাশের ধারাবাহিকতা।
এই ইতিহাস সংরক্ষণ করা কেবল অতীতচর্চার বিষয় নয়; এটি উত্তরবঙ্গের আত্মপরিচয় নির্মাণেরও অপরিহার্য অংশ। কাকিনা রাজবাড়ি, পুরোনো রেলওয়ে স্থাপনা, মুঘল আমলের প্রশাসনিক স্মৃতি কিংবা কোচবিহার রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রত্নঐতিহ্য—এসবকে ঘিরে পরিকল্পিত গবেষণা, সংরক্ষণ ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন গড়ে তোলা গেলে লালমনিরহাট কেবল সীমান্ত জেলা হিসেবেই নয়, ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবেও নতুনভাবে পরিচিতি লাভ করবে।
একটি জাতি তার ইতিহাস যত গভীরভাবে জানে, তার ভবিষ্যৎ নির্মাণও তত দৃঢ় হয়। লালমনিরহাটের ইতিহাস সেই আত্মপরিচয়েরই এক মূল্যবান অধ্যায়—যেখানে কোচবিহারের রাজদণ্ড, মুঘল সাম্রাজ্যের পতাকা এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের নকশা মিলেমিশে গড়ে তুলেছে আজকের এই জনপদের বহুমাত্রিক পরিচয়।
লেখক : সিনিয়র সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।
নেতা দেশ প্রেমিক কি না যাচাই করার উপায়
১ সপ্তাহ আগে
কিস্তির বেড়াজালে গ্রাম
২ সপ্তাহ আগে
লালমনিরহাট জেলা-শিল্প উন্নয়নে বাধা-২
৩ সপ্তাহ আগে
হারিয়ে যাচ্ছে পীরতন্ত্র
৩ সপ্তাহ আগে