ভ্রমণ মানেই অনেক টাকা খরচ, দীর্ঘ ছুটি কিংবা দূরের কোনো পরিকল্পনা এমন ধারণা এখনও অনেকের। অথচ ইচ্ছা থাকলে মাত্র এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যেই একদিনে দেখা মিলতে পারে বিস্তীর্ণ হাওড়, নীল লেক, পাহাড়, ঝর্ণা আর মেঘে মোড়া এক অপার্থিব প্রকৃতির। সেই অভিজ্ঞতার নাম-টাঙ্গুয়ার হাওড়।
বর্ষা যেন টাঙ্গুয়ার হাওড়ের সবচেয়ে আপন ঋতু। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এই সময় হাওড় তার আসল রূপে ধরা দেয়। তাই এবারের গন্তব্যও ছিল প্রকৃতির এই অনন্য জলভূমি।
আমার যাত্রা শুরু হয় ঢাকা শহরের মিরপুর থেকে। প্রথমে মিরপুর থেকে মেট্রোরেলে মতিঝিল পর্যন্ত। সেখান থেকে রিকশায় সায়েদাবাদ এবং সায়েদাবাদ থেকে একটি ট্যুর গ্রুপের বাসে করে নেত্রকোনার কমলাকান্দার উদ্দেশ্যে রওনা হই। রাতভর পথ পেরিয়ে ভোর ছয়টায় পৌঁছে যাই কমলাকান্দায়।
সেখান থেকেই শুরু হয় প্রকৃতির আরেক অধ্যায়। হাউজবোটে চড়ে ওয়াচ টাওয়ারের পথে এগোতে এগোতে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন ধীরে ধীরে কোনো ছবির ভেতরে প্রবেশ করছি। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। সেই পানির বুকে আকাশের সাদা মেঘের প্রতিবিম্ব, দূরে সবুজের রেখা আর মাঝেমধ্যে ভেসে যাওয়া ছোট ছোট নৌকা সব মিলিয়ে এমন এক দৃশ্য, যা ব্যস্ত শহুরে জীবনের সব ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর করে দেয়।
ওয়াচ টাওয়ারে পৌঁছে হাওড়ের স্বচ্ছ পানিতে গোসলের অনুভূতি ছিল পুরো ভ্রমণের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। প্রকৃতির এত কাছাকাছি নিজেকে সঁপে দেওয়ার এমন সুযোগ বারবার আসে না। মনে হচ্ছিল, শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনটাও যেন নতুন করে সতেজ হয়ে উঠছে।
এরপর প্রায় দেড় ঘণ্টার নৌভ্রমণ শেষে পৌঁছে যাই নীলাদ্রি লেকে। দুপুরের খাবার শেষ করে মাত্র ৫০০ টাকায় একটি মোটরসাইকেল ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ি আশপাশের কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে।
পথে একপাশে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়, অন্যপাশে বিস্তীর্ণ হাওড়। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা মেঘ, সবুজে ঢাকা টিলা আর হাওড়ের শান্ত জলরাশি যেন প্রকৃতির নিখুঁত এক মেলবন্ধন। এমন দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করা যায়, কিন্তু তার অনুভূতি ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন।
প্রথম গন্তব্য ছিল বারিক টিলা। জায়গাটিতে দাঁড়ানোর পর প্রথম যে অনুভূতিটি আসে, তা হলো এ কি সত্যিই বাংলাদেশ? চোখের সামনে সারি সারি পাহাড়, দূরে মেঘালয়ের ঝর্ণা, পাহাড়ের বুকজুড়ে ভেসে থাকা সাদা মেঘ আর নিচে সবুজের বিস্তার সব মিলিয়ে মনে হয় যেন কোনো কল্পলোকের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। প্রকৃতিকে এত কাছ থেকে অনুভব করার জন্য বারিক টিলা নিঃসন্দেহে অসাধারণ একটি জায়গা।
বারিক টিলা থেকে যাই স্থানীয়দের কাছে 'সুইজারল্যান্ড' নামে পরিচিত একটি স্থানে। নামটি শুনে হয়তো অনেকেরই কৌতূহল জাগবে। কিন্তু সেখানে পৌঁছালে বোঝা যায় কেন এমন নাম। নির্জন সবুজ প্রান্তর, পাহাড়ঘেরা পরিবেশ আর শান্ত প্রকৃতি জায়গাটিকে আলাদা এক সৌন্দর্য দিয়েছে। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলেই মনে হবে সময় যেন থেমে গেছে।
এরপরের গন্তব্য সাদা পাথর। পাহাড়ি ঝরনার স্বচ্ছ পানি ছোট-বড় সাদা পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে। পানির মৃদু শব্দ, পাহাড়ি বাতাস আর চারপাশের নীরবতা মিলিয়ে জায়গাটি এক অনন্য প্রশান্তির জন্ম দেয়। অনেকটা সিলেটের সাদা পাথরের অনুভূতি পাওয়া যায় এখানেও।
সবশেষে আবার ফিরে আসি নীলাদ্রি লেকে। অনেকেই নীলাদ্রি লেককে ‘বাংলার কাশ্মীর’ বলে থাকেন। এই উপাধি যে অযৌক্তিক নয়, সেখানে না গেলে বোঝা সম্ভব নয়। লেকের স্বচ্ছ নীল পানি, চারপাশের উঁচু টিলা, ঠিক পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘালয়ের পাহাড় আর পাহাড়ের গায়ে ভেসে থাকা মেঘ সব মিলিয়ে এটি যেন প্রকৃতির নিখুঁত এক শিল্পকর্ম। সূর্যের আলো পানিতে পড়লে পুরো লেকটি নীল কাঁচের মতো ঝলমল করে ওঠে, আর সন্ধ্যার আলোয় সেই সৌন্দর্য পায় অন্য এক মাত্রা।
একদিনের এই ভ্রমণ শেষে মনে হয়েছে, ভ্রমণের সৌন্দর্য বাজেটের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে গন্তব্য আর সেই গন্তব্যকে অনুভব করার ওপর। টাঙ্গুয়ার হাওড় শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি প্রকৃতির এক জীবন্ত কবিতা, যেখানে প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি মেঘ আর প্রতিটি বাতাসের স্পর্শ নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
স্বল্প সময়ে প্রকৃতির এত বৈচিত্র্য একসঙ্গে উপভোগ করতে চাইলে টাঙ্গুয়ার হাওড় হতে পারে আপনারও পরবর্তী গন্তব্য।
ভ্রমন অভিজ্ঞতাকারী - মিনহাজুল ইসলাম বাপ্পি
অধ্যয়নরত, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম যোগাযোগ বিভাগ
গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
[email protected]
জন্ডিস হলেই মসলাবিহীন খাবার খেতে হবে-এ ধারণা ভুল
১৪ ঘন্টা আগে
মায়ের দুধই নবজাতকের প্রথম সুরক্ষা
৪ দিন আগে
মোবাইলেই শনাক্ত করুন হোটেল কক্ষের গোপন ক্যামেরা
২ সপ্তাহ আগে