বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিস্তা প্রকল্পে বেইজিংয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি এলাকায় চীনের উপস্থিতি নিয়ে নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ভারতীয় বিশ্লেষকদের ধারণা, তিস্তা নদীর উন্নয়ন ও সংরক্ষণের আড়ালে চীন এই অঞ্চলে নিজেদের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে ভারত সরকার আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মঙ্গলবার (১২ মে) এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হবে। একইসঙ্গে ভারত আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকায় চীনের কর্মকাণ্ডের ওপরও নজরদারি বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান-এর সঙ্গে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর বৈঠকে তিস্তা প্রকল্প গুরুত্ব পায়। ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ নামে পরিচিত এই পরিকল্পনায় নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ ও নদী ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের অবকাঠামোগত কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, চীন এই প্রকল্পে যুক্ত হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বেইজিংয়ের কৌশলগত নজরদারির আওতায় চলে আসতে পারে। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-র সরকারের সময় প্রকল্পটি ভারতকে দেওয়ার আলোচনা থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো ঢাকাকে চীনের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের দাবি, ব্রহ্মপুত্র নদে চীনের একের পর এক বাঁধ নির্মাণের কারণে ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশই ক্ষতির মুখে পড়ছে। মেকং নদীতে চীনের বাঁধ নির্মাণের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, এতে ভাটির দেশগুলোতে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।
ভারতের আশঙ্কা, ব্রহ্মপুত্র নদে চীনের নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতে ‘পানিবোমা’র ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে আসাম, অরুণাচলসহ বাংলাদেশেও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তিস্তা প্রকল্পে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার আগে ব্রহ্মপুত্রে বাঁধ নির্মাণ ইস্যুতে বেইজিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করার পরামর্শ দিয়েছে ভারত।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি চীন স্বীকার করেছে যে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় তারা পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তা করেছিল। এ প্রসঙ্গে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত আগে থেকেই এ ধরনের সহযোগিতার বিষয়ে অবগত ছিল। তার ভাষ্য, ‘অপারেশন সিঁদুর’ ছিল পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট জঙ্গি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি নির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত পাল্টা অভিযান।
সব মিলিয়ে তিস্তা প্রকল্প, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে ঘিরে ভারত এখন আরও সতর্ক ও কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করছে।
সূত্র: ইত্তেফাক