মৃত্যুর সময় তাঁর সম্পত্তি বলতে ছিল মাত্র চার জোড়া ধুতি-পাঞ্জাবি ও এক আলমারি ভর্তি বই । শেষ জীবনে থাকতেন এক কামরার একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে। চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পেরে ১৯৯০ সালে নীরবেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান প্রফুল্লচন্দ্র সেন । অথচ তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৃতীয় মুখ্যমন্ত্রী। সাদা খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি, মিতভাষী স্বভাব, অনাড়ম্বর জীবন, সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন একজন সৎ রাজনীতিবীদ। প্রশাসনে কড়াকড়ি ছিল, আপসের জায়গা কম। অনেকেই বলতেন, 'প্রফুল্লবাবু নিয়ম মানেন, আর নিয়ম মানাতেও জানেন।' অথচ একসময় বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে রটিয়ে দেয়, তিনি নাকি স্টিফেন হাউস-ই কিনে নিয়েছেন ।
১৯৬২ সালে বিধানচন্দ্র রায়ের প্রয়াণের পর প্রফুল্লচন্দ্র সেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন। সে সময় বাংলাজুড়ে তীব্র খাদ্য সংকট। অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যশস্য মজুত করে বাজারে ব্ল্যাক শুরু করেছিল। খাদ্য সংকট মেটাতে প্রফুল্লচন্দ্র সেন চালু করেছিলেন রেশন ব্যবস্থা এবং লেভি সিস্টেম। যার নির্যাস, সত্ প্রফুল্লের উপরে ক্ষেপে গেল মজুতদাররা। তারা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকারের বিরুদ্ধে উস্কে দিতে লাগল। বামদলগুলি প্রচার করা শুরু করল, জোতদারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রফুল্ল সেন নাকি স্টিফেন হাউস কিনে নিয়েছেন।
খাদ্য সংকটের সময় প্রফুল্লচন্দ্র সেন মানুষকে ভাতের পরিমাণ কম করে রুটি, শাকসবজি, কাঁচকলা খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—'আপনারা ভাতের সঙ্গে কাঁচকলা, পটল, কুমড়ো সিদ্ধ খেয়ে পেট ভরাতে পারেন।' এ বক্তব্য ঘিরেই তুমুল আলোড়ন শুরু হয়ে যায় । সেই থেকে লোকমুখে তাঁর নাম হয়ে যায়. কাঁচকলা সেন !
১৮৯৭ সালের ১০ এপ্রিল খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে জন্ম প্রফুল্লচন্দ্র সেনের। ছোটবেলায় চলে আসেন দেওঘরে, পরে কলকাতায় পড়াশোনা। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ফিজিক্স অনার্স নিয়ে স্নাতক হন। উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় মহাত্মা গান্ধীর কলকাতার ভাষণ। গান্ধীবাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রফুল্ল সেন সত্যাগ্রহ ও স্বদেশি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কর্মক্ষেত্র বেছে নেন আরামবাগকে । আরামবাগে সে সময়ে ম্যালেরিয়ার প্রবল প্রকোপ। তবু সেখানেই জীবনের দীর্ঘ ৬০ বছর কাটান প্রফুল্লচন্দ্র সেন। জনসাধারণের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘আরামবাগের গান্ধী’ নামে। শিক্ষকতা করেছেন হুগলির স্কুলে। কাঁথি ও তমলুকে হওয়া ‘লবণ আইন অমান্য আন্দোলন’, ১৯৪০ সালের ‘সত্যাগ্রহ আন্দোলন’ এবং ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন প্রফুল্লচন্দ্র সেন । স্বদেশী কাজের পাশাপাশি ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে বন্যা বিধ্বস্ত আরামবাগের বিস্তীর্ণ এলাকায় ত্রাণ বিলি করেন।
১৯৪৮ সালে ড. বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভায় তিনি যোগ দেন অসামরিক সরবরাহ দফতরের মন্ত্রী হিসেবে। বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর, ২ জুলাই, ১৯৬২ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৬৭ সালের নির্বাচন বাংলার রাজনীতিতে পালাবদলের সূচনা করে। কংগ্রেস পরাজিত হয়, যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। দীর্ঘদিনের কংগ্রেস শাসনের ইতি ঘটে। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে আরামবাগ থেকেই বাংলা কংগ্রেস সভাপতি অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের কাছে প্রফুল্ল সেন পরাজিত হন। বলা হয়, সেদিন কলকাতার বাজারে কাঁচকলার দাম দ্বিগুণ হয়েছিল ! এরপর পড়াশোনা আর লেখালেখি নিয়েই থাকতেন অকৃতদার মানুষটি। ১৯৯০ সালে প্রয়াত হন প্রফুল্ল সেন ।
আজকের দিনে এইরকম সৎ, নির্লোভ কোনও রাজনীতিবিদের কথা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।
প্রণাম প্রফুল্লচন্দ্র সেন
© অহর্নিশ
তথ্য : এইসময়, ie বাংলা, আজতক বাংলা