শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ১৩ চৈত্র ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ আন্তর্জাতিক

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় তাবুর জীবন


প্রকাশ :

ফিলিস্তিনের গাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি থাকলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ একটুও কমেনি। দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েলি হামলায় উপত্যকার অধিকাংশ স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় লাখো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাবু খাটিয়ে বসবাস করছেন, যেখানে নিরাপদ বাসস্থান ও মৌলিক সেবার চরম ঘাটতি রয়েছে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, পেটের রোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আবু আমরের পরিবারকে অন্তত ১৭ বার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। প্রতিবার বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবন আরও সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে গাজার রিমাল এলাকায় একটি আবর্জনার ভাগাড়ের পাশে তাবু খাটিয়ে থাকতে হচ্ছে পরিবারটিকে। দূষণ, রোগ আর মানবেতর পরিবেশের সঙ্গে প্রতিদিন সংগ্রাম করেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাদের।

৬৪ বছর বয়সী আবু আমর বলেন, গাজায় তাদের জীবন যেন দুটি বিপর্যয়ের মাঝে আটকে আছে—একদিকে বোমার আতঙ্ক, অন্যদিকে আবর্জনার দুর্গন্ধ। তিনি জানান, অ্যাজমার কারণে সব সময় ইনহেলার সঙ্গে রাখতে হয়। রাতে বালিশের নিচে রেখে দেন, কারণ ময়লার গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হলে বারবার ব্যবহার করতে হয়।

আবু আমরের পুত্রবধূ সুরাইয়া আবু আমর পাঁচ সন্তানের মা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাবুতে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি মানা প্রায় অসম্ভব। বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, হামলার আগে তাদের জীবন ছিল পরিচ্ছন্ন ও স্বাভাবিক। বাইত আল-লাহিয়া থেকে গাজা নগরীতে আশ্রয় নিতে গিয়ে এমন দুঃসহ বাস্তবতার মুখোমুখি হবেন, তা কল্পনাও করেননি।

সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং অধিকাংশ ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুদ্ধবিরতির পরও চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। অনেক বাসিন্দার ধারণা, গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলতেই এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে।

৪০ বছর বয়সী সেলিম বলেন, আবর্জনার পাশে বসবাস করায় পরিবারটি চরম মানসিক চাপে আছে। তার সন্তানরা শীত ও গরমে মারাত্মক কষ্ট পাচ্ছে। দুর্গন্ধের কারণে খাবার খেতেও সমস্যা হয়, অনেক সময় বমি আসে। তিনি জানান, ঝড়-বৃষ্টির সময় নর্দমার পানি তাবুর ভেতরে ঢুকে পড়ে। পরিষ্কার কাপড়ের অভাবে কখনো কখনো নোংরা কাপড়েই নামাজ আদায় করতে হয়।

সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশুরা। ১৩ বছর বয়সী রাহাফ জানায়, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে তার চুল পড়ছে এবং ত্বকে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, ময়লা-আবর্জনা, নর্দমার পানি ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে গাজায় রোগব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আল-শিফা মেডিক্যাল কমপ্লেক্সের ফুসফুস বিভাগের প্রধান আহমেদ আলরাবিই বলেন, গাজার জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের আগে এ ধরনের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত জটিলতা কখনো দেখা যায়নি।

গাজার মিউনিসিপ্যাল কর্মকর্তারা জানান, হামলায় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। গাজা নগরীতে দেড় লাখ মিটারের বেশি পাইপলাইন এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ পানির কূপ নষ্ট হয়েছে। পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টও কার্যত অচল।

এদিকে গাজার পূর্বাঞ্চলে বর্জ্য ফেলার স্থানে প্রবেশে বাধা থাকায় শহরজুড়ে ময়লার স্তূপ জমছে। মিউনিসিপ্যালিটির তথ্য অনুযায়ী, পুরো উপত্যকায় সাত লাখ টনের বেশি বর্জ্য জমে আছে, যার বড় অংশ গাজা নগরীতেই।