ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়তে থাকায় উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করছে পশ্চিমা শক্তিগুলো। এর অংশ হিসেবে কাতারে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাজ্য।
শুক্রবার ব্রিটিশ সরকার জানায়, আঞ্চলিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় দোহা সংলগ্ন আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে এসব যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়েছে। কাতার সরকারের আমন্ত্রণে মোতায়েন করা এই টাইফুনগুলো যৌথ আরএএফ–কাতারি ইউনিট ‘নম্বর ১২ স্কোয়াড্রন’-এর অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এর মূল লক্ষ্য উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা আরও জোরদার করা।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি বলেন, এই যৌথ অংশীদারত্ব দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের মাধ্যমে কাতারের আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যা যুক্তরাজ্য ও কাতারের অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থকে আরও সুদৃঢ় করবে।
এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রও। মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, যা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ একটি পূর্ণাঙ্গ স্ট্রাইক গ্রুপ বহন করছে, আগামী সপ্তাহের শুরুতে উপসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বুধবার রণতরীটি মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করেছে। এর সঙ্গে রয়েছে গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ও সাবমেরিন। পাশাপাশি প্যাট্রিয়ট ও থাড (THAAD) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জামও পাঠানো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার রাতে বলেন, ‘যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি’ হিসেবেই ইরানের দিকে এই নৌবহর পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে আরেকটি বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ভার্জিনিয়ার নরফোক ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে বলেও জানা গেছে, যা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্র দ্য ন্যাশনালকে জানিয়েছে, এই সামরিক সমাবেশ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। সূত্রের মতে, কাতারে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান মোতায়েন কেবল আশ্বাসমূলক পদক্ষেপ নয়; বরং ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলা মোকাবিলায় একটি অতিরিক্ত প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করাও এর উদ্দেশ্য। বিশেষ করে ইরানের তৈরি শাহেদ–১৩৬ ড্রোন প্রতিহত করতে টাইফুন যুদ্ধবিমানকে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে।
টাইফুন যুদ্ধবিমানগুলো এর আগেও সিরিয়ায় আইএসআইএসবিরোধী অভিযানে এবং গত বছর ইয়েমেনে হুতি লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, কাতারে এই মোতায়েন সম্পূর্ণভাবে ‘প্রতিরক্ষামূলক ও সহযোগিতামূলক’ এবং এটি যুক্তরাজ্য–কাতার প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তা চুক্তির আওতায় নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, আল উদেইদ বিমানঘাঁটি আগেও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর পাল্টা জবাবে এই ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান। এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সদর দপ্তর অবস্থিত, যা ঘাঁটিটিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এর আগে ইসরায়েল–ইরান যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কায় যুক্তরাজ্য এই অঞ্চলে অতিরিক্ত কন্টিনজেন্সি সাপোর্ট পাঠিয়েছিল। এছাড়া ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময়ও নিরাপত্তা সহায়তার অংশ হিসেবে টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছিল।
এদিকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শিগগিরই প্রায় ৫০ কোটি পাউন্ড ব্যয়ে টাইফুন যুদ্ধবিমানগুলোর রাডার ব্যবস্থার বড় ধরনের উন্নয়ন করা হবে, যা এগুলোর যুদ্ধক্ষমতা আরও বাড়াবে।