সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ আন্তর্জাতিক

আমিরাতের সঙ্গে সব চুক্তি বাতিল সোমালিয়ার


প্রকাশ :

লোহিত সাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে করা সব ধরনের চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সোমালিয়া সরকার। এর ফলে দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও সামরিক স্থাপনা থেকে আমিরাতকে সরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মোগাদিশুর ভাষ্য, দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার প্রমাণ পাওয়ার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সোমালিয়ার এক জ্যেষ্ঠ সরকারি সূত্র ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, সোমবার সরকারিভাবে আমিরাতের সঙ্গে করা সব চুক্তি বাতিল করা হয়। এতে ফেডারেল সরকার, সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং আঞ্চলিক প্রশাসনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সব সমঝোতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সিদ্ধান্তের আওতায় বেরবেরা, বসাসো ও কিসমায়ো বন্দরে আমিরাতের সঙ্গে চলমান সব সহযোগিতাও বাতিল হয়েছে।

এছাড়া দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ সব চুক্তি বাতিলের অনুমোদন দিয়েছে সোমালিয়ার মন্ত্রিসভা। সরকার বলছে, দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করার বিষয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রমাণ’ পাওয়ার পরই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশটির অনেক নাগরিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এটিকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষায় সঠিক পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন। সোমালিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আবদুল্লাহি ফারমাজোও সিদ্ধান্তটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে আমিরাতের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে সোমালিল্যান্ড সরকারের এক মন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে বলেন, বেরবেরা সোমালিল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং আমিরাত তাদের ‘বিশ্বস্ত মিত্র’। তার দাবি, মোগাদিশুর সিদ্ধান্ত বাস্তবে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

এরই মধ্যে জানা গেছে, আমিরাত সোমালিয়ার বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি থেকে তাদের সেনা ও সরঞ্জাম সরিয়ে নিচ্ছে। এর মধ্যে পুন্তল্যান্ডের বসাসো শহরের একটি ঘাঁটিও রয়েছে, যেখান থেকে সুদানের র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসে সরবরাহ পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। সোমালিয়ার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, আমিরাত তাদের নিরাপত্তা সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম প্রতিবেশী ইথিওপিয়ায় স্থানান্তর করছে। তবে পুন্তল্যান্ড প্রশাসন কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইসরায়েল–আমিরাত–সোমালিল্যান্ড প্রসঙ্গ

সাম্প্রতিক সময়ে সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে, বিশেষ করে সোমালিল্যান্ড ইস্যুতে। গত ২৬ ডিসেম্বর ইসরায়েল প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আদেন উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন বেরবেরা বন্দরকে ঘিরেই এই স্বীকৃতি নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

স্বীকৃতির পর ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার প্রথম সরকারি সফরে বেরবেরা যান এবং সোমালিল্যান্ডকে ‘পশ্চিমাপন্থী ও ইসরায়েলবান্ধব’ হিসেবে উল্লেখ করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বেরবেরায় সম্ভাব্য সামরিক ঘাঁটি স্থাপন নিয়েও ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ডের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এই বন্দর ইতোমধ্যেই লোহিত সাগর ও আদেন উপসাগরে আমিরাত-নিয়ন্ত্রিত সামরিক স্থাপনার নেটওয়ার্কের অংশ।

এদিকে গত সপ্তাহে আমিরাত-সমর্থিত ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা আইদারুস আল-জুবাইদিকে বহনকারী একটি জাহাজ বেরবেরায় নোঙর করে। পরে সৌদি আরব অভিযোগ করে, আমিরাত তাকে সোমালিল্যান্ড হয়ে আবুধাবিতে নিয়ে গেছে।

২০১৭ সাল থেকে সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক শুরু হয়, যখন সেখানে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তাব গ্রহণ করে স্থানীয় প্রশাসন। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেরবেরায় আমিরাতের নৌঘাঁটিটি বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ সামরিক স্থাপনায় রূপ নিয়েছে। এখানে আধুনিক নৌবন্দর, গভীর পানির জেটি, দীর্ঘ রানওয়ে ও বিমান হ্যাঙ্গার রয়েছে। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ রানওয়েটি ভারী সামরিক বিমান ও যুদ্ধবিমান ওঠানামার উপযোগী।

বেরবেরা বন্দরের মালিকানা যৌথভাবে রয়েছে আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড, সোমালিল্যান্ড সরকার এবং ব্রিটিশ সরকারের বিনিয়োগ সংস্থা ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্টের হাতে।

বিশ্লেষকদের মতে, আমিরাতের সঙ্গে সব চুক্তি বাতিলের এই সিদ্ধান্ত সোমালিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে।