বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
☰ সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

আইফোনের লোভেই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা, তিন জবানবন্দিতে মিলল ভয়াবহ বর্ণনা


প্রকাশ : (১ মাস আগে)
আইফোনের লোভেই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা, তিন জবানবন্দিতে মিলল ভয়াবহ বর্ণনা

ছবি তোলা ও টিকটক করার সূত্রে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের সঙ্গে পরিচয় হয় কয়েকজন তরুণের। সেই পরিচয় থেকেই ঘনিষ্ঠতা। একপর্যায়ে অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি লোভ তৈরি হয় তাদের। ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে শুরু হয় তাকে হত্যার পরিকল্পনা। পরে ছবি তোলার কথা বলে অপ্রতিমকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে তার কাছ থেকে প্রথমে আইফোন নেওয়া হয়। ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়।

কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যা মামলায় তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন নেওয়া এবং হামলার বিষয়ে তিনজনের বক্তব্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। তবে হত্যার সময় কে কোথায় ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে কী করেছেন, সে বিষয়ে তাদের বর্ণনায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

আগেই হয়েছিল হত্যার পরিকল্পনা

তিন জবানবন্দির মধ্যে তুহিনের বক্তব্যে হত্যার পরিকল্পনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি জানান, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। তাঁর বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও করার জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বের হতো।

তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের আইফোন দেখে তাঁর এবং অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সেখানেই অপ্রতিমের আইফোন নেওয়া এবং তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

ওই কিশোরও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আগের শুক্রবারের বৈঠকের কথা উল্লেখ করেছে। তবে হত্যার পরিকল্পনার মূল উদ্যোগ তুহিনের ছিল বলে সে দাবি করেছে। অপর কিশোরের বক্তব্যেও এসেছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার বন্ধু তাকে জানায়, তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।

তিন আসামির বক্তব্য মিলিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্টদের কাছে যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো, হত্যাকাণ্ডটি তাৎক্ষণিক কোনো বিরোধ থেকে ঘটেনি। আইফোন নেওয়ার উদ্দেশ্যে আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তাদের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

টিকটক থেকে যোগাযোগ, ছবি তোলার কথা বলে ডাকা

তুহিনের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। তখন অপ্রতিম তাঁকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। রাতে টিকটকের মাধ্যমে অপ্রতিমকে বার্তা পাঠান তুহিন। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে ওই নম্বরেও তাদের কথা হয়।

পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়। অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরকেও আসতে বলেছিল বলে তুহিনের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। পরিকল্পনা ছিল ছবি তোলার। সেই সুযোগেই অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নেওয়া হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ১৩ বছরের অপ্রতিমের চেয়ে বয়সে ৫ থেকে ১০ বছর বড় কয়েকজন যুবকের সঙ্গে তার মেলামেশার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে।

 চারজনের মিলন পাহাড়ে

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের দেখা হয়। তুহিনের ভাষ্য, এরপর কৌশলে অপ্রতিমকে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান তিনি। ওই এলাকাটি নির্জন এবং তাঁর চাচা শাহ আলমের পাহাড় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তুহিন।

অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, দুপুরের পর কোটবাড়ীর বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সে আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। যাওয়ার আগেই বন্ধুটিকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায়।

অপর কিশোরের বক্তব্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে তার সঙ্গে ওই কিশোরের দেখা হয়। তখন তাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ে গিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনকে সেখানে বসে থাকতে দেখে।

চারজন একত্র হওয়ার পর কিছু সময় গল্প ও আড্ডা হয় বলেও তিনজনের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

আইফোন নেওয়ার পরই শুরু হয় বিরোধ

দোকানে কর্মরত কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম তাকে আইফোন দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে তুলে দেয়।

তুহিনের বক্তব্যেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর ভাষ্য, ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর ফোনটি তাঁর হাতে দেয়। এরপর ফোন ফেরত চাওয়া নিয়ে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

একপর্যায়ে তুহিন অপ্রতিমকে থাপ্পড় দেন। পরে পাশে পড়ে থাকা একটি কোদালের হাতল নিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এরপর অন্য দুই কিশোরকেও মারধরে অংশ নিতে বলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

অন্য দুই আসামির বক্তব্যেও তুহিনের হাতে প্রথম আঘাত করার বিষয়টি উঠে এসেছে।

আইফোন বিক্রি করে টাকা ভাগের পরিকল্পনা

জবানবন্দিগুলোতে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তুহিন বলেছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাঁদের লোভ তৈরি হয়েছিল।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের বক্তব্য অনুযায়ী, আইফোনটি বিক্রি করে পাওয়া টাকা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। অপর কিশোরের জবানবন্দিতেও আইফোন বিক্রির পর টাকা ভাগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ তিন আসামির বক্তব্যেই আইফোনকে হত্যার পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হত্যার পরও ফোনটি ছিল তুহিনের কাছে

অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর কে কোন পথে ঘটনাস্থল ছাড়ে, সে বিষয়ে তিন আসামির বক্তব্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। তুহিনের ভাষ্য, অন্য দুই কিশোর একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন।

অন্যদিকে দ্বিতীয় আসামি জানিয়েছে, অপ্রতিমের মৃত্যুর পর সে তার বন্ধুর সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে আসে। তখন তুহিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তৃতীয় কিশোরও প্রায় একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে।

তবে একটি বিষয়ে তিন জবানবন্দিতে মিল রয়েছে। অপ্রতিমের আইফোনটি শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল।

তুহিনের জবানবন্দিতে সিয়ামকে ঘিরে প্রশ্ন

তুহিনের বক্তব্যে তাঁর বন্ধু মো. সিয়াম (১৯) সম্পর্কেও তথ্য এসেছে। তুহিন বলেছেন, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাকে পুরো ঘটনা জানান। এমনকি হত্যার পরিকল্পনার কথাও সিয়াম আগে থেকে জানতেন বলে তুহিনের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে অন্য দুই আসামির বক্তব্যে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়নি।

পুলিশ পরে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য, তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি। তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মরদেহ উদ্ধারের পরও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা

জবানবন্দিতে হত্যার পরদিনের ঘটনাও উঠে এসেছে। তুহিন জানিয়েছেন, সকালে অপ্রতিমের মামা তাঁকে ফোন করে তার খোঁজ করেন। পরে তিনি সিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে কোটবাড়ী এলাকায় অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরও জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমকে খুঁজতে বের হয়েছিল। পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়।

অপর কিশোরের বক্তব্য অনুযায়ী, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দেয়।

এরই মধ্যে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তদন্ত ও বিচারেই মিলবে পূর্ণ সত্য

অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।

২০ সেপ্টেম্বর আদালতে তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছিল, তাদের বক্তব্য অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। হত্যাকাণ্ডে আর কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তিন জবানবন্দি পর্যালোচনায় অপ্রতিমের সঙ্গে পরিচয়, আইফোনের প্রতি লোভ, আগে থেকে পরিকল্পনা, ছবি তোলার কথা বলে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, ফোন নেওয়া এবং এরপর হামলার বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল পাওয়া গেছে। তবে প্রত্যেকের ভূমিকা ও দায় কতটা, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

অপ্রতিমের পরিবার ও স্বজনদের এখন অপেক্ষা ঘটনার পূর্ণ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আদালতের বিচারের জন্য।

বিজ্ঞাপন