শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

সেকালের পথ ধরে একালের বাটুল ভাই স্মরণ নয়, সাংবাদিকতার উত্তরাধিকার পুনর্গঠনের দায়


প্রকাশ : (১২ ঘন্টা আগে)
সেকালের পথ ধরে একালের বাটুল ভাই স্মরণ নয়, সাংবাদিকতার উত্তরাধিকার পুনর্গঠনের দায়

কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের সময় শেষ হয় না। বরং সময় যত বদলায়, তাঁদের প্রয়োজন তত গভীর হয়ে ওঠে। খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল তেমনই একজন মানুষ। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী তাই নিছক একজন সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা কিংবা সাবেক জনপ্রতিনিধিকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি উত্তরবঙ্গের সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখার সুযোগ। একই সঙ্গে এটি আমার নিজের জীবনেরও একটি সময়কে ফিরে দেখার সুযোগ—যে সময়ে রংপুরের সাংবাদিকতা, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও নাগরিক জীবনের নানা আলোড়নের সঙ্গে আমারও নিবিড় যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল।

২০২০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বাটুল ভাই চলে গেছেন। দেখতে দেখতে ছয় বছর। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেছে। সংবাদপত্রের প্রযুক্তি বদলেছে, সাংবাদিকতার ভাষা বদলেছে, সংবাদ প্রকাশের গতি বেড়েছে, এসেছে অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। কিন্তু কিছু মানুষের স্মৃতি সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না। বরং নতুন সময়ের সংকট যত গভীর হয়, তাঁদের কথা তত বেশি মনে পড়ে। বাটুল ভাই আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।
সত্তর দশকের রংপুরে দৈনিক দাবানল অফিসটি ছিল আমার আড্ডার অন্যতম ঠিকানা। তখনকার সেই দাবানল অফিস আজকের চোখে কল্পনা করলে হয়তো তার আবহ বোঝা কঠিন। সংবাদপত্রের অফিস মানেই তখন শুধু খবর তৈরির জায়গা ছিল না; সেটি ছিল এক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনস্থল। সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী, লেখক, সংস্কৃতিকর্মী, ছাত্র-যুবক—বিভিন্ন মত ও পথের মানুষের আনাগোনা ছিল সেখানে। খবর নিয়ে আলোচনা হতো, রাজনীতি নিয়ে তর্ক হতো, সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে কথা হতো, আবার কখনো নিছক আড্ডাও জমে উঠত।
আমি সেই আড্ডার একজন নিয়মিত মানুষ ছিলাম।
দাবানল অফিসে ঢুকলেই মনে হতো, একটি জীবন্ত সময়ের ভেতরে প্রবেশ করছি। কাগজের গন্ধ, ছাপার অক্ষর, ব্যস্ততার মধ্যে সাংবাদিকদের ছোটাছুটি, কোনো খবর নিয়ে উত্তেজিত আলোচনা, কোথাও কোনো অন্যায়ের ঘটনা ঘটেছে—তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক—সব মিলিয়ে জায়গাটি ছিল এক অন্যরকম প্রাণের কেন্দ্র। আজকের ডিজিটাল নিউজরুমের সঙ্গে তার কোনো তুলনা চলে না। কিন্তু সেই সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সেখানে যে সংবাদচেতনা, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সমাজকে বদলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেটিই ছিল তার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
আর সেই পরিবেশের প্রাণকেন্দ্রে ছিলেন বাটুল ভাই।
বাটুল ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেবল সাংবাদিক ও পাঠকের সম্পর্ক ছিল না। তিনি ছিলেন বড় ভাইয়ের মতো। তাঁর কাছে যাওয়ার মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। তিনি মানুষকে কাছে টানতে জানতেন। তাঁর সঙ্গে বসলে মনে হতো, কথা বলার জন্য কোনো প্রস্তুতি দরকার নেই। রাজনীতি থেকে সমাজ, সংবাদ থেকে সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুই তাঁর আলোচনার বিষয় হতে পারত।
সত্তর দশকের সেই সময়টি ছিল আমাদের প্রজন্মের জন্য এক বিশেষ সময়। দেশ সদ্য স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতার স্বপ্ন, যুদ্ধের স্মৃতি, নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট—সবকিছু মিলিয়ে সমাজ ছিল প্রবল আলোড়নের মধ্যে। সেই সময় সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ জানতে চাইত কী ঘটছে, কেন ঘটছে এবং রাষ্ট্র ও সমাজ কোন পথে যাচ্ছে।
দৈনিক দাবানল সেই প্রশ্নগুলোর অনেকটাই ধারণ করত।
বাটুল ভাইয়ের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের প্রতি তাঁর পক্ষপাত। তিনি সংবাদপত্রকে কেবল খবর প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখতেন না; দেখতেন মানুষের কথা বলার জায়গা হিসেবে। উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষের জীবন, কৃষকের সমস্যা, শ্রমজীবী মানুষের বঞ্চনা, নদীভাঙন, যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংকট—এসব বিষয় তাঁর সাংবাদিকতায় গুরুত্ব পেত।
ঢাকার সংবাদপত্রে তখন উত্তরবঙ্গের খবর অনেক সময় প্রান্তিক গুরুত্ব পেত। কিন্তু বাটুল ভাই মনে করতেন, উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনও বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি গ্রামের রাস্তা ভেঙে যাওয়া, একটি নদীর গতিপথ বদলে যাওয়া, কোনো কৃষকের ফসল নষ্ট হওয়া কিংবা কোনো দরিদ্র পরিবারের সন্তান শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া—এসবও জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ।
এখানেই তাঁর সাংবাদিকতার স্বাতন্ত্র্য।
তিনি বুঝেছিলেন, রাজধানী থেকে একটি দেশের সব বাস্তবতা দেখা যায় না। দেশের প্রকৃত চেহারা দেখতে হলে যেতে হয় মানুষের কাছে। যেতে হয় মাঠে, নদীর ধারে, গ্রামে, হাটে-বাজারে। শুনতে হয় সেই মানুষের কথা, যার কণ্ঠস্বর অনেক সময় ক্ষমতার করিডরে পৌঁছায় না।
সেই অর্থে বাটুল ভাই ছিলেন উত্তরবঙ্গের জনমানুষের সাংবাদিক।
তাঁর এই যাত্রা অবশ্য স্বাধীনতার পর শুরু হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের মুক্তাঞ্চল থেকে তাঁর সম্পাদনায় রণাঙ্গন প্রকাশিত হয়েছিল। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ সময়ে একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করা ছিল এক অসাধারণ সাহসের কাজ। সংবাদ তখন শুধু তথ্য ছিল না; সংবাদ ছিল মনোবল, প্রতিরোধ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে রাখার শক্তি।
স্বাধীনতার পর মহাকাল ও দৈনিক দাবানল–এর মাধ্যমে তিনি সেই সাংবাদিকতার ধারাকে আরও বিস্তৃত করেন। তাঁর কাছে সংবাদপত্র ছিল একটি প্রতিষ্ঠান, আর সাংবাদিকতা ছিল সামাজিক দায়িত্ব।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সত্তর দশকের সেই দাবানল অফিসের কথা মনে পড়লে পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয়। তখন সংবাদ তৈরি হতো ধীর গতিতে, প্রযুক্তি ছিল সীমিত, যোগাযোগব্যবস্থা ছিল দুর্বল। আজ একটি ঘটনা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। স্মার্টফোনের ক্যামেরা, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, লাইভ সম্প্রচার, ডেটা সাংবাদিকতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাংবাদিকতার পরিসরকে আমূল বদলে দিয়েছে।
কিন্তু প্রযুক্তি বদলালেও সাংবাদিকতার মৌলিক প্রশ্ন বদলায়নি—সাংবাদিকতা কার জন্য?
মানুষের জন্য, নাকি বাজারের জন্য?
সত্যের জন্য, নাকি ভিউ ও ক্লিকের জন্য?
ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার জন্য, নাকি ক্ষমতার সঙ্গে আপস করার জন্য?
এই প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড়ালেই বাটুল ভাইয়ের সাংবাদিকতার কথা মনে পড়ে।
কারণ তাঁর সময়ের সাংবাদিকতায় প্রযুক্তির চাকচিক্য ছিল না, কিন্তু ছিল মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। আজ আমাদের হাতে প্রযুক্তির অভাব নেই; অভাব কখনো কখনো দেখা যায় সেই দায়বদ্ধতার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে তথ্যের প্রবাহ বেড়েছে, কিন্তু অপতথ্যও বেড়েছে। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় কখনো কখনো তথ্য যাচাই পিছিয়ে পড়ে। রাজনৈতিক প্রভাব, মালিকানার স্বার্থ, বিজ্ঞাপননির্ভরতা ও করপোরেট নিয়ন্ত্রণ সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সাংবাদিকতার সংকট এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়; বিশ্বাসযোগ্যতারও।
এই জায়গায় বাটুল ভাইয়ের সাংবাদিকতা আমাদের একটি সহজ কিন্তু কঠিন শিক্ষা দেয়—সংবাদকে মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মত থাকতে পারে। কিন্তু সংবাদকে দলীয় প্রচারণায় পরিণত করা যায় না। মতামত ও সংবাদ এক নয়। সাংবাদিকের কাজ কারও পক্ষে অন্ধভাবে দাঁড়ানো নয়; বরং তথ্যের পক্ষে দাঁড়ানো, জনস্বার্থের প্রশ্ন সামনে আনা এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা।
সত্তর দশকের সেই দাবানল অফিসের আড্ডাগুলো তাই আজও আমার কাছে শুধু স্মৃতি নয়; সেগুলো আমার সাংবাদিকতা ও সমাজভাবনার এক ধরনের পাঠশালা। সেখানে কথার মধ্যে দিয়ে আমরা সময়কে বুঝতাম, মানুষের সমস্যা নিয়ে ভাবতাম, রাজনীতি নিয়ে তর্ক করতাম, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম। বাটুল ভাইয়ের মতো মানুষদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ ছিল—কীভাবে মানুষের কথা শুনতে হয়, কীভাবে একটি ঘটনার ভেতরের বৃহত্তর বাস্তবতাকে দেখতে হয়।
আজকের প্রজন্মের সাংবাদিকদের কাছে সেই অভিজ্ঞতা হয়তো সরাসরি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সেই চেতনা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
আর এ কারণেই বাটুল ভাইকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর জীবনের প্রশংসা করা নয়; তাঁর রেখে যাওয়া সাংবাদিকতার দর্শনকে নতুন সময়ের সঙ্গে যুক্ত করা।
আজ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা নানা ধরনের চাপের মধ্যে কাজ করেন। রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতাশালী মহলের চাপ, হামলা-মামলা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁদের পেশাগত স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। অথচ একটি গণতান্ত্রিক সমাজে স্থানীয় সাংবাদিকতাই অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রহরীর ভূমিকা পালন করে।
রাষ্ট্রের তাই দায়িত্ব রয়েছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে রাজনৈতিক ও করপোরেট নির্ভরতা থেকে বের করে আনতে স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন বিজ্ঞাপননীতি প্রয়োজন। সাংবাদিকদের তথ্য যাচাই, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, ডেটা সাংবাদিকতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহারে প্রশিক্ষিত করতে হবে।
একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের সাংবাদিকতার ইতিহাসও সংরক্ষণ করতে হবে।
রণাঙ্গন, মহাকাল ও দৈনিক দাবানল কেবল পুরোনো সংবাদপত্র নয়; এগুলো উত্তরবঙ্গের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের দলিল। এসব পত্রিকার পুরোনো সংখ্যা সংগ্রহ করে ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আঞ্চলিক সাংবাদিকতার ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
বাটুল ভাইয়ের স্মৃতিকে স্থায়ী করে রাখার জন্য তাঁর নামে একটি সাংবাদিকতা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। তরুণ সাংবাদিকদের জন্য চালু হতে পারে ‘বাটুল সাংবাদিকতা ফেলোশিপ’। অনুসন্ধানী ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার জন্য প্রবর্তন করা যেতে পারে ‘বাটুল সাংবাদিকতা পুরস্কার’।
এগুলোই হবে স্মৃতিকে কর্মে রূপ দেওয়ার পথ।
কারণ মানুষকে সবচেয়ে ভালোভাবে স্মরণ করা যায় তাঁর প্রতিকৃতি টাঙিয়ে নয়—তাঁর অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে।
আজও যখন দৈনিক দাবানল–এর সেই অফিসের কথা মনে পড়ে, মনে হয়—সময় কত বদলে গেছে! সেই আড্ডার জায়গায় হয়তো আজ আর আগের সেই পরিবেশ নেই। সংবাদপত্রের প্রযুক্তি বদলে গেছে, সংবাদ তৈরির ধরন বদলে গেছে, মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম বদলে গেছে। কিন্তু আমার স্মৃতিতে দাবানল অফিস এখনো একটি জীবন্ত জায়গা—যেখানে বাটুল ভাই ছিলেন, যেখানে সংবাদ নিয়ে কথা হতো, মানুষের কথা নিয়ে আলোচনা হতো, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা হতো।
সেই স্মৃতি আমাকে আজও প্রশ্ন করে—আমরা কি সেই স্বপ্নের সাংবাদিকতা ধরে রাখতে পেরেছি?
আমরা কি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারছি?
আমরা কি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সাহস রাখছি?
আমরা কি উত্তরবঙ্গের মানুষের কথা উত্তরবঙ্গ থেকেই বলছি?
আমরা কি সংবাদকে বাজারের পণ্য নয়, মানুষের জানার অধিকার হিসেবে দেখছি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। কিন্তু প্রশ্নগুলো হারিয়ে ফেলাই হবে সবচেয়ে বড় বিপদ।
বাটুল ভাইয়ের প্রতি আমাদের ঋণ তাই শুধু স্মৃতির ঋণ নয়; এটি একটি দায়িত্বের ঋণ। তাঁর সময়ের প্রযুক্তি আমাদের নেই, কিন্তু তাঁর সময়ের সাহস আমাদের প্রয়োজন। তাঁর সময়ের সংবাদপত্রের কাঠামো হয়তো আর ফিরবে না, কিন্তু মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ সাংবাদিকতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
স্মরণসভা হবে, ফুল দেওয়া হবে, বক্তৃতা হবে—এসবের প্রয়োজন আছে। কিন্তু ছয় বছর পর বাটুল ভাইকে স্মরণ করতে গিয়ে আমাদের আরও এক ধাপ এগোতে হবে। তাঁর নামে একটি স্থায়ী সাংবাদিকতা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, একটি আঞ্চলিক সংবাদ আর্কাইভ এবং তরুণ সাংবাদিকদের জন্য ফেলোশিপ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে তাঁর স্মৃতি কেবল অতীতের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে না; ভবিষ্যতের সাংবাদিকতারও একটি ভিত্তি হয়ে উঠবে।
সত্তর দশকে দাবানল অফিস ছিল আমার আড্ডার ঠিকানা। আজ সেই আড্ডার দিন নেই, সেই সময়ও নেই। কিন্তু স্মৃতির ভেতরে সেই জায়গাটি এখনো উজ্জ্বল। বাটুল ভাইয়ের কণ্ঠ, তাঁর সঙ্গে আলোচনা, তাঁর মানুষের প্রতি টান, সংবাদপত্র নিয়ে তাঁর স্বপ্ন—সবকিছু যেন সেই সময়ের ভেতর থেকে আজও কথা বলে।
সেই কণ্ঠ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাংবাদিকতা শেষ পর্যন্ত মানুষেরই জন্য।
সেকালের পথ আমাদের হুবহু অনুসরণ করতে হবে না। কিন্তু সেকালের সাহসকে সঙ্গে নিতে হবে। প্রযুক্তির নতুন শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সাংবাদিকতাকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে নিতে হবে। সংবাদকে পণ্য নয়, নাগরিকের অধিকার হিসেবে দেখতে হবে। আঞ্চলিক সাংবাদিকতাকে প্রান্তিক নয়, জাতীয় জীবনের অপরিহার্য আয়না হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তাহলেই বাটুল ভাইকে স্মরণ করা সার্থক হবে।
কারণ মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন থেকে যায়। প্রতিষ্ঠান ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু আদর্শ নতুন প্রতিষ্ঠানের ভিত হতে পারে। একটি আড্ডার স্মৃতি একদিন একটি প্রজন্মের সাংবাদিকতার পাঠ হয়ে উঠতে পারে।
সত্তর দশকের সেই দাবানল অফিস আজ হয়তো আর নেই। কিন্তু বাটুল ভাইয়ের সাংবাদিকতার যে আগুন—মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর, সত্যকে সামনে আনার, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার—সেই আগুন যেন নিভে না যায়।
সেকালের পথ হারিয়ে নয়—সেকালের সাহস সঙ্গে নিয়ে একালের সাংবাদিকতাকে নতুন করে নির্মাণ করাই হোক বাটুল ভাইয়ের প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।

লেখক: শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও সভাপতি তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ

বিজ্ঞাপন