রংপুর নগরীর ড্রেনেজ সহ সকল পানি প্রবাহের অন্যতম খাল শ্যামাসুন্দরী দখল-দূষণে মৃত প্রায়|শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এ খাল সংস্কারে চলছে প্রায় ১৫ কোটি টাকার প্রকল্প|যা ব্যয় হবে খাল পুনঃখনন, দূষণ রোধ ও বনায়নে| তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, বর্তমান পরিকল্পনায় এটি টেকসই সমাধান নয়|ফলে নগর বাসীর প্রশ্ন উঠেছে এ প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর না হলে ইউনুস সরকার কেন অর্থ তছরুপের এ প্রকল্পে সায় দিয়েছেন? শ্যামাসুন্দরী খাল খনন করার কথা থাকলেও বালতি-কোদাল দিয়ে কাদা-আবর্জনা তুলে খালের পাড়ে রাখছেন শ্রমিকেরা| সেগুলো আবার বৃষ্টির পানিতে গড়িয়ে পড়ছে খালে|স্থানীয়দের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও শ্যামাসুন্দরী যদি তার ¯^াভাবিক রূপ ফিরে না পায়, তাহলে এই অর্থ ব্যয় করে কি লাভ|
সরেজমিনে দেখা যায়, খালটির বিভিন্ন অংশে এখনও আবর্জনার স্তুপ, দখল আর সংকুচিত জলধারা প্রবাহের চিত্র স্পষ্ট| শুধু তাই নয়, এক সময়ের প্রায় ১৫০ ফুট প্রশস্ত শ্যামাসুন্দরী খাল এখন অনেক জায়গায় মাত্র ৩০ ফুটে নেমে এসেছে| হাঁটার মতো জায়গাও নেই| কোথাও কচুরিপানা, কোথাও কালো দুর্গন্ধ যুক্ত পানি, কোথাও আবার পলিথিন ও গৃহস্থালি বর্জ্যের স্তুপ| খালের দুইপাড় দখল করে গড়ে উঠেছে ভবন, দোকান ও স্থাপনা|সামান্য বৃষ্টি হলে পানি প্রবাহ না থাকায় আশপাশের এলাকা তলিয়ে ঘরবাড়ি ডুবে যাচ্ছে পানিতে|
নগরীর নুরপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শ্যামাসুন্দরী খাল খনন করার কথা থাকলেও বালতি-কোদাল দিয়ে কাদা-আবর্জনা তুলে খালের পাড়ে রাখছেন শ্রমিকেরা| সেগুলো আবার বৃষ্টির পানিতে গড়িয়ে পড়ছে খালে|স্থানীয়দের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও শ্যামাসুন্দরী যদি তার ¯^াভাবিক রূপ ফিরে না পায়, তাহলে এই অর্থ ব্যয় করে কি লাভ|
নুরপুর এলাকার বাসিন্দা নরু হাসান বলেন, খাল খনন হবে বড় বড় মেশিনসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে কিন্তু আমার এলাকায় খাল খননে বালতি ব্যবহার করা হচ্ছে| বালতি দিয়ে ময়লা তুলে পাড়ে রাখার পর সেই ময়লা আবার বৃষ্টির পানিতে খালে পড়ে জমাট বাঁধছে| এভাবে কাজ করলে কোটি কোটি টাকা নয়-ছয় হবে| কোন সংস্কারও হবে না, উন্নয়নও হবে না|রংপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ড সংস্কারের নামে লুটপাটের কাজ করছে|
নগরীর শাপলা চত্বর এলাকার বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, খালের দুই পাশের কচুগাছ, ময়লা আবর্জনা আর কচুরিপানা সরানোর নাম যদি সংস্কার হয় তাহলে এসবের দরকার কি? প্রতিবছরই তো দেখি খাল পরিষ্কার হয়| কিছুদিন পর আবার আগের মতো হয়ে যায়| আসল সমস্যা তো দখল আর ড্রেনের ময়লা|বৃষ্টি হলে খাল উপচে আশপাশের বাড়িঘর ও নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়|
মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানা রোড এলাকার পারুল বেগম বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই খাল পানিতে ভরাট হয়| ড্রেনের পানি উপচে পড়ে রাস্তা ও ঘরে ঢোকে| ময়লা আবর্জনায় খালের তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে| আমরা চাই খালের দুই পারে অবৈধ দখল উচ্ছেদ হোক| সরকার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়া যেন শুধু শুধু রাষ্ট্রের টাকা নষ্ট না করে|
প্রসঙ্গত, ১৮৯০ সালে রংপুর পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান ও ডিমলার রাজা জানকি বল্লভ সেন তার মা শ্যামাসুন্দরীর স্মরণে শ্যামাসুন্দরী খাল খনন করেন| রংপুর নগরের উত্তর-পূর্ব দিকে সিও বাজার কেল্লাবন্দ ঘাঘট থেকে শুরু হয়ে শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে মাহিগঞ্জ এলাকার খোখসা ঘাঘটে মিশেছে| শ্যামাসুন্দরী খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ কিলোমিটার| বর্তমানে চলমান প্রকল্পের আওতায় নগরীর চেকপোস্ট থেকে সাতমাথা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সংস্কার করা হবে| ২০২৫ সালের নভে¤^রে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৭ সালের জুন মাষে|
সরেজমিনে দেখা গেছে, খালের দুই পাড়ের অধিকাংশ অংশই দখল হয়ে যাওয়ায় সেখানে গাছ লাগানোর পর্যাপ্ত জায়গা নেই| একারণে নবায়নের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার আশংকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা|
বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ কর্মীরাও বলছেন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ঘাঘট নদের সঙ্গে সংযোগ পুনরুদ্ধার এবং পূর্ণাঙ্গ খনন ছাড়া এই প্রকল্পে অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়|তাদের মতে, বাস্তবতা বিবেচনায় এই প্রকল্প অনুমোদন করা হয়নি|বরং অন্তর্র্বতী সরকার এমন প্রকল্প অনুমোদন করে রাষ্ট্রীয় অর্থ বিফলে বরাদ্দ করেছে|
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, শ্যামাসুন্দরীকে বাঁচাতে হলে আগে দখলদার উচ্ছেদ করতে হবে| ঘাঘট নদের সঙ্গে সংযোগ ফিরিয়ে আনতে হবে| শুধু ওপরের ময়লা সরিয়ে ছবি তোলার মতো প্রকল্পে কোনো লাভ হবে না|পরিকল্পনাহীন ভাবে শুধু সৌন্দর্য বর্ধনমূলক কাজ করে খাল বাঁচানো সম্ভব নয়| শ্যামাসুন্দরী খালের ওপর বর্তমানে রয়েছে ৩৫টি সেতু এবং খালটির দুই পাশে চার শতাধিক দখলদার রয়েছে| এ অবস্থায় এমন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ|
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের আওতায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা প্রকল্পে গত বছরের নভে¤^রে শ্যামাসুন্দরী পুনঃখনন, দূষণ রোধ ও বনায়নের জন্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়| প্রকল্পের আওতায় আগাছা ও কচুরিপানা পরিষ্কার, প্লাস্টিক অপসারণ, পানি অপসারণ, মাটি খনন ও পরিবহন, সিসি ব্লক নির্মাণ, পাইল বসানোসহ নানা খাতে বিপুল ব্যয়ের হিসাব রাখা হয়েছে| শুধু পাইল রডেই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা|শ্যামাসুন্দরী খাল পুনঃখনন, দূষণরোধ ও বনায়ন’ শীর্ষক এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা| এর মধ্যে খাল পুনঃখননে ব্যয় হবে ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং দূষণ মুক্তকরণ ও ¯^াস্থ্যবিধান খাতে ৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা| এছাড়া বনায়নের জন্য রাখা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা|
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, শ্যামা সুন্দরী এখন আর খাল নেই| এটি ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে| খাল খনন ও সম্প্রসারণ হাইপোথিটিক্যাল হয়ে গেছে| সিটি করর্পোরেশনে কেউ প্ল্যান দেওয়ার না থাকায় আমরাই প্ল্যান দিয়েছিলাম| এখন এটা আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে| বর্তমান প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে| তবে ডেঙ্গুর উপদ্রব কমবে| ময়লা আবর্জনা সরানোর ফলে পানি প্রবাহে কিছুটা ¯^াভাবিক গতি ফিরবে|
রংপুর সিটি করর্পোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন বলেন, নিয়ম মেনেই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছেন| নগরবাসী যেন কোনো রকম অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ না পায়|