বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে তিস্তা নদী শুধু একটি নদী নয়—এটি জীবন, জীবিকা এবং টিকে থাকার প্রতীক। অথচ এই নদীই আজ তাদের জন্য এক অনিশ্চয়তার নাম। শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য হাহাকার, বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা—এই দ্বিমুখী সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে বহুদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে “তিস্তা মহাপরিকল্পনা”। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই প্রকল্প কতদূর এগিয়েছে? আর কেনই বা এটি এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি?
তিস্তা মহাপরিকল্পনা মূলত একটি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ, যার লক্ষ্য নদী খনন, পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান Power Construction Corporation of China-এর মাধ্যমে প্রণীত সমীক্ষায় তিস্তাকে কেন্দ্র করে একটি বৃহৎ উন্নয়ন করিডোর গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়—যেখানে নদী থাকবে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে।
এই সমীক্ষায় নদী ড্রেজিং, দুই তীরে বাঁধ নির্মাণ, জলাধার সৃষ্টি এবং নদীর দুই পাশে আধুনিক নগরায়নের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এ নিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, ২০১৬ সালে।পাওয়ার চায়না ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (২০১৬-২০১৯) ৩ বছর ব্যাপী সমীক্ষা শেষে " তিস্তা নদী সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার " শীর্ষক মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করে।প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৯৮৩ দশমিক ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডালার।প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন কারিগরি সহযোগিতা ও বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও ' ভূ-রাজনীতির দ্বৈরথে ' তা শেষমেষ তিস্তা চুক্তির মতো ঝুলে যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রকল্পটির প্রথম ধাপের ব্যয় মূল্যায়ন করেছে। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রথম ধাপে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৭ শত কোটি টাকা China-এর কাছ থেকে ঋণ হিসেবে চাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে এবং বাকি অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকল্পের বেশিরভাগ আনুষ্ঠানিকতা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে—এখন মূলত চীনের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরই বাকি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও উল্লেখযোগ্য। ইউনুস সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।ইউনুস সরকার আমলের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান শেষমুহুর্তে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়ভার নির্বাচিত সরকারের কাঁধে চাপিয়ে " পত্রপাঠ " বিদায় নেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উত্তরাঞ্চলে প্রধান ইস্যু ছিল " তিস্তা মহাপরিকল্পনা। " সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা অববাহিকার জনপদের মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা বাস্তবায়নের। কিন্তু বাস্তবে বহুকাঙ্ক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে এখনো ঘোষণা করা হয়নি—যা জনমনে নতুন করে প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি করেছে।
তিস্তা প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে যে ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল, সেটিও এখন এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। India ও China-এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে—যদি এই দুই শক্তিধর দেশ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সমন্বয়ের পথে হাঁটে।এক্ষেত্রে আমাদের সরকারের পক্ষ থেকেও অব্যাহত রাখতে হবে " বুদ্ধিদীপ্ত কুটনৈতিক" প্রচেষ্টা।"
বাস্তবে, তিস্তা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে Nepal, Bhutan এবং বাংলাদেশসহ সমগ্র হিমালয় অববাহিকার পানি প্রবাহ। যদি চীন-ভারত-নেপাল-ভূটান-বাংলাদেশ একসঙ্গে একটি অভিন্ন নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ( বিদ্যুত, পানি, সেচ, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বানিজ্য) তা হবে বিশ্বে এক অনন্য উদাহরণ।
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা—এই তিনটি প্রধান নদীকে ঘিরে সমতা- ন্যায্যতার ভিত্তিতে একটি বহুপক্ষীয় সহযোগিতা কাঠামো গড়ে উঠলে তা দক্ষিণ এশিয়ায় পানি নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন,বানিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক শান্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা এই বৃহত্তর সহযোগিতার একটি সূচনা বিন্দু হতে পারে।
বিশেষ করে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে যদি India ও China-এর মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা যায়, তাহলে তা উভয় দেশের জন্যই কল্যাণকর হবে। এতে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত উদ্বেগ অনেকটাই কমে আসবে, একই সঙ্গে বাংলাদেশও পাবে একটি কার্যকর উন্নয়ন প্রকল্প। সবচেয়ে বড় কথা, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানির প্রবাহ নিশ্চিত করার একটি বাস্তবসম্মত পথ তৈরি হতে পারে।
এই জটিল সমীকরণের মধ্যেও একটি বিষয় অনস্বীকার্য—উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-সংগ্রাম। তিস্তা পাড়ের কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে সেচের অভাবে ফসল ফলাতে পারেন না, আবার বর্ষায় নদী ভাঙনে সর্বস্ব হারান। তাদের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার লড়াই।
এই লড়াইকে সংগঠিত রূপ দিয়েছে “তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ” ও " তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন" জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই শ্লোগানে দীর্ঘদিন ধরে তারা মিছিল, মানববন্ধন, মশাল প্রজ্জ্বলনসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দাবি করে আসছে। তাদের কণ্ঠে এখন একটাই স্লোগান—প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন চাই। সংগঠনগতভাবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের কাছে তাদের দাবি-
১) দ্রুত একনেক সভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রাক্কলিত ২ হাজার ৪ শত কোটি টাকা অনুমোদন সাপেক্ষে আগামী শুস্ক মোসুমে তিস্তা প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজের উদ্বোধন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট ও সময়বদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণা।
২)" সরকারিভাবে তিস্তা বন্ড" চালু করে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা।
৩) তিস্তার বালু ও পাথর উত্তোলনে সরকারি ব্যবস্থাপনা এবং সেই অর্থ প্রকল্পে বিনিয়োগ।
৪) তিস্তা ব্যারাজ সেচ খালের সম্প্রসারণ ও তিস্তা তীর সংরক্ষণে বিক্ষিপ্ত এবং বিচ্ছিন্নভাবে অর্থ ব্যয়,অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করে তা " সমন্বিত তিস্তা প্রকল্পে" বিনিয়োগ।
৫) প্রকল্প পরিচালক (PD) নিয়োগ।
৬) ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নে " তিস্তা বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ " গঠন।
সরকার পরম্পরায় তাদের প্রতিশ্রুতির ঘাটতি নেই, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরগতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ করছে। এখন প্রয়োজন স্পষ্ট সময়সূচি, স্বচ্ছ অর্থায়ন কাঠামো এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি। চীনের সঙ্গে চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করা, একই সঙ্গে আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় থেকে একটি বহুপক্ষীয় পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া—এই দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে না দেখে মানুষের জীবন-জীবিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উন্নয়ন যেন মানুষের জন্য হয়—এই নীতিকে সামনে রেখে এগোতে হবে। তিস্তা আজ একটি পরীক্ষার নাম—রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং জনগণের দাবির প্রতি দায়বদ্ধতার পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এখন সময়ের দাবি।
(লেখক পরিচিতি: লেখক: সভাপতি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ)