দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিট চালুর পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষার ফলাফল অনুমোদনের পর পরবর্তী ধাপের কমিশনিং কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও কারিগরি কার্যক্রম সম্পন্ন হলে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বহুমুখী হবে। পাশাপাশি শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চারের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদনের কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় পরবর্তী কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। পরে উচ্চ চাপে দুই দফা পরীক্ষা সম্পন্ন করে ফলাফল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার পরীক্ষার ফলাফল অনুমোদন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পরীক্ষায় নিয়ন্ত্রণ ভালভ নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা হয়। একই সঙ্গে অগ্নিনিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয়তা-সংক্রান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও পরীক্ষা করা হয়।
এ অগ্রগতির পর এখন রূপপুরের সামনে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ও স্বনির্ভর পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। পর্যায়ক্রমে চুল্লির তাপ উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে টারবাইন চালু এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পরীক্ষামূলক উৎপাদন থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে নিরাপত্তা যাচাই ও কারিগরি কার্যক্রমের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে হবে।
বিদ্যুৎ চাহিদার বড় অংশ পূরণের সম্ভাবনা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় নির্মিত এ কেন্দ্রে ব্যবহার করা হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটি দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করতে পারবে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘমেয়াদি হিসাব।
তবে প্রকৃত অবদান নির্ভর করবে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা, কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা, তেল বা গ্যাসের মতো জ্বালানি পুড়িয়ে তাপ তৈরি করতে হয় না। চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের পরমাণুর বিভাজন বা নিউক্লিয়ার ফিশনের মাধ্যমে উৎপন্ন তাপ দিয়ে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হয়। সেই বাষ্প টারবাইন ঘোরায় এবং জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রূপপুর কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। প্রয়োজনীয় কারিগরি সংস্কার, নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে এ মেয়াদ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং নির্দিষ্ট সময় পর পারমাণবিক জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে।
দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে
রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ধারণা স্বাধীনতার পরপরই আলোচনায় আসে। ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান সফরাটমের মাধ্যমে ১২৫ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও তখন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সমীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত থাকে। ১৯৯৬ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৫ সালে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি এবং ২০০৭ সালে ৫০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।
পরে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে বর্তমান প্রকল্পের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করে। এখন প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তব উৎপাদনের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ বিভিন্ন সরকারের সময়ে এগিয়েছে। বিএনপির ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি ছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার অব্যাহত রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্মার্ট গ্রিড সম্প্রসারণ, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যের কথাও ইশতেহারে রয়েছে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অর্থনীতিতে প্রভাব
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পারমাণবিক শক্তি উইংয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নেরও বড় সুযোগ।
তিনি জানান, প্রথম ইউনিট উৎপাদনের প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়ামও প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। নির্ধারিত সময়সীমার আগেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
একই উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব বলেন, রূপপুর চালু হলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বাসসকে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।
তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটম কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করে কেন্দ্রটি চালু করা হবে।
সব মিলিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে নির্ধারিত নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ, নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনা এবং জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সীমান্তে গুলিবিদ্ধ যুবকের মরদেহ উদ্ধার
১৮ ঘন্টা আগে